আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির প্রয়াণ-পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক ভয়াবহ অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে। গতকাল শনিবার মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ বিমান হামলায় খামেনির নিহতের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর, ইরান তার সামরিক শক্তির চূড়ান্ত ব্যবহারের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) ঘোষণা করেছে, তারা মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ওপর ইতিহাসের সবচেয়ে বিধ্বংসী আক্রমণ চালাতে যাচ্ছে। ইতিমধেই কাতার, বাহরাইন, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো তেহরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
Table of Contents
দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের শঙ্কা ও ট্রাম্পের দাবি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দিতে পারলে মাত্র কয়েক দিনেই এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটবে। তবে সামরিক বিশ্লেষকরা ভিন্ন কথা বলছেন। ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন যে, ইরান দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে এবং প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রকেও দীর্ঘ সময় ধরে অভিযান চালিয়ে যেতে হবে। ইরানের এই টিকে থাকার লড়াইয়ের মূলে রয়েছে তাদের কয়েক দশকের অর্জিত আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তি, যা তারা মূলত রাশিয়ার কারিগরি সহায়তায় গড়ে তুলেছে।
ইরানের অস্ত্রভাণ্ডার ও প্রযুক্তির উৎস
ইরানের কাছে বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডার রয়েছে। শাহাব-৩ এবং সেজজিলের মতো প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি তাদের হাতে রয়েছে অত্যাধুনিক ‘ফাত্তাহ-১’ এর মতো হাইপারসনিক মিসাইল। এগুলো ২,০০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম, যার আওতায় রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি মার্কিন ঘাঁটি ও ইউরোপের একাংশ। এছাড়া ইরানের ‘শাহেদ-১৩৬’ এবং ‘মোহাজের-৬’ ড্রোনের ঝাঁক যেকোনো উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করতে সক্ষম।
নিচে ইরানের সামরিক সক্ষমতার প্রধান স্তম্ভগুলো একটি টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| সামরিক সরঞ্জাম | প্রযুক্তির ধরন | সক্ষমতা ও বৈশিষ্ট্য |
| ফাত্তাহ-১ | হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র | শব্দের চেয়ে কয়েক গুণ দ্রুত এবং রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম। |
| শাহেদ-১৩৬ | কামিকাজে ড্রোন | স্বল্প খরচে তৈরি, যা ঝাঁক বেঁধে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। |
| সেজজিল | ব্যালিস্টিক মিসাইল | ২,০০০ কিমি পাল্লা, যা ইসরায়েল ও ইউরোপের একাংশে পৌঁছাতে সক্ষম। |
| ভারবা সিস্টেম | ম্যানপ্যাড (রাশিয়া প্রদত্ত) | নিচু দিয়ে উড়া ড্রোন ও হেলিকপ্টার ধ্বংস করতে কার্যকর। |
| রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রোন | মার্কিন নকশা ভিত্তিক | যুক্তরাষ্ট্রের ‘সেন্টিনেল’ ড্রোনের আদলে তৈরি দেশীয় সংস্করণ। |
পশ্চিমা প্রযুক্তি বনাম ইরানের উদ্ভাবন
সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, ইরান এখন পশ্চিমাদের তৈরি প্রযুক্তি ব্যবহার করেই পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। ইউক্রেন যুদ্ধের ময়দান থেকে রাশিয়া যেসব পশ্চিমা অস্ত্র যেমন—জ্যাভলিন অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইল বা স্টিঙ্গার এয়ার-ডিফেন্স সিস্টেম জব্দ করেছে, সেগুলো সরাসরি তেহরানে পাঠানো হয়েছে। ইরানের প্রকৌশলীরা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এই প্রযুক্তিগুলোর ‘রিভার্স-ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা হুবহু নকল তৈরি করে নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছেন। এমনকি চীনের মাধ্যমেও অনেক সময় পশ্চিমা ডিজাইনের ইঞ্জিনের নকশা ও খুচরা যন্ত্রাংশ ইরানের হাতে পৌঁছেছে।
নৌ-যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালী সংকট
সমুদ্রপথে ইরান তাদের ‘সাগর অবরোধ’ কৌশল কার্যকর করতে মরিয়া। তারা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ ‘হরমুজ প্রণালী’ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। ইরানের নৌবাহিনী তাদের দ্রুতগামী অ্যাটাক বোট, মিজেট সাবমেরিন এবং চীনা ডিজাইনের শক্তিশালী অ্যান্টি-শিপ ক্রুজ মিসাইল ব্যবহার করে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোর জন্য ত্রাস সৃষ্টি করেছে। এমনকি সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজকে ড্রোনবাহী রণতরীতে রূপান্তর করে সমুদ্রের মাঝখান থেকেই আকাশপথে আক্রমণ চালানোর সক্ষমতা তারা অর্জন করেছে।
পরিশেষে বলা যায়, ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটি যদি তাদের শেষ লড়াইও লড়ে, তবে তারা কোনোভাবেই বিনা যুদ্ধে হার মানবে না। বছরের পর বছর ধরে চলা কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান যেভাবে রাশিয়ার হাত ধরে পশ্চিমা অস্ত্রের সফল নকল তৈরি করে নিজেদের সুরক্ষিত করেছে, তা আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তপ্ত রণক্ষেত্রে এখন দেখার বিষয়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্রুত জয়ের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয় নাকি ইরান দীর্ঘস্থায়ী গেরিলা যুদ্ধের পথে হাঁটে।
