দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের মজুদ পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে রয়েছে এবং অদূর ভবিষ্যতে মূল্যবৃদ্ধির কোনো আশঙ্কা নেই বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান। মঙ্গলবার (৩ মার্চ) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে করপোরেশনের প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি দেশের জ্বালানি সরবরাহ, মজুদ ও আমদানি পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।
তিনি জানান, দেশে বর্তমানে মোট ১ লাখ ৩৬ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেল মজুদ রয়েছে, যা চলমান চাহিদা পূরণে সক্ষম। এই মজুদ দেশের পরিবহন, কৃষি, বিদ্যুৎ ও শিল্পখাতে নিয়মিত সরবরাহ বজায় রাখতে সহায়ক হবে। সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটার সম্ভাবনা নেই বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন।
নিরবচ্ছিন্ন আমদানি কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে গতকাল পর্যন্ত সাতটি জাহাজের ঋণপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব জাহাজ পর্যায়ক্রমে দেশে পৌঁছাবে এবং মজুদ আরও শক্তিশালী করবে। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা থাকলেও আমদানি পরিকল্পনা অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
জ্বালানির ধরনভেদে মজুদের স্থায়িত্ব ভিন্ন। ডিজেল, যা পরিবহন ও কৃষিখাতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়, তার মজুদ রয়েছে প্রায় ১৪ দিনের। অকটেনের মজুদ ২৮ দিনের, পেট্রলের ১৫ দিনের, ফার্নেস তেলের ৯৩ দিনের এবং জেট ফুয়েলের ৫৫ দিনের সমপরিমাণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত ফার্নেস তেলের তুলনামূলক বেশি মজুদ বিদ্যুৎখাতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
নিচে বর্তমান মজুদের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলোঃ
| জ্বালানির ধরন | মজুদের স্থায়িত্ব (দিন) | প্রধান ব্যবহার ক্ষেত্র |
|---|---|---|
| ডিজেল | ১৪ দিন | পরিবহন, কৃষি, শিল্পকারখানা |
| অকটেন | ২৮ দিন | ব্যক্তিগত ও গণপরিবহন |
| পেট্রল | ১৫ দিন | হালকা যানবাহন |
| ফার্নেস তেল | ৯৩ দিন | বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প |
| জেট ফুয়েল | ৫৫ দিন | বিমান চলাচল |
চেয়ারম্যান আরও বলেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য যুদ্ধাবস্থার প্রভাব বিবেচনায় রেখে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটলে যাতে দেশের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, সে জন্য আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। পর্যাপ্ত মজুদ ও ধারাবাহিক আমদানি নিশ্চিত হওয়ায় নিকট ভবিষ্যতে মূল্যবৃদ্ধির প্রয়োজন হবে না বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে সংরক্ষণাগারের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি, আমদানি উৎসের বৈচিত্র্য আনা এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। বিশেষত গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি ও কৃষি মৌসুমে সেচ কার্যক্রমের কারণে ডিজেলের ব্যবহার বেড়ে যায়। এ সময় পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পরিবহন ব্যবস্থার সম্প্রসারণের ফলে প্রতিবছর জ্বালানি তেলের চাহিদা বাড়ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পকারখানার সংখ্যা বৃদ্ধিও জ্বালানি নির্ভরতা বাড়িয়েছে। ফলে সুষ্ঠু পরিকল্পনা, সময়মতো আমদানি এবং দক্ষ সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
সার্বিক বিবেচনায় বর্তমান জ্বালানি মজুদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও নিরাপদ। সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থা বাজার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, যাতে সরবরাহ ও মূল্য স্থিতিশীল থাকে এবং সাধারণ জনগণের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি না হয়।
