পর্দার মইন্না, বাস্তবের লড়াই বিজয়ী লিয়ন

গাজীপুরের বোর্ডবাজারে রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে রাজমিস্ত্রির জোগালির কাজ করা সেই ছেলেটি একসময় চলচ্চিত্র প্রেমীদের হৃদয় ছুঁয়েছিল পর্দায়। আজ সে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পীর মর্যাদা অর্জন করেছেন। ‘আম-কাঁঠালের ছুটি’ সিনেমায় মইন্না চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ২০২৩ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন মোঃ লিয়ন আহমেদ। এর আগে তিনি মেরিল–প্রথম আলো সমালোচক পুরস্কারও জিতেছিলেন।

ময়মনসিংহের চরপাড়ার ছেলে লিয়নের জীবন যেন নিজেই এক বাস্তবধর্মী সিনেমার গল্প। শৈশবের প্রথম বছরেই পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে এসে পড়ে। অভাবের সংসার সামলাতে একসময় তিনি গাজীপুরে আসেন। পোশাক কারখানায় কাজের চেষ্টা ব্যর্থ হয় জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকার কারণে। পরবর্তীতে বোর্ডবাজারে থিতু হয়ে বাবার সঙ্গে রাজমিস্ত্রির জোগালির কাজ শুরু করেন।

রোদ-বৃষ্টি, ঘাম আর ধুলো—প্রতিদিন তিন-চার তলায় সিঁড়ি বেয়ে ইট-সিমেন্ট ওঠানো ছিল তার দৈনন্দিন জীবন। মাসে ১০–১৫ দিন কাজ করতে হয়, মেসে সহকর্মীদের সঙ্গে থাকে। যা আয় হয়, তার একটি অংশ পরিবারে পাঠান।

তবু এক দশক আগে লিয়নের জীবন অন্য এক আলোয় ঝলমল করেছিল।

সালসিনেমাচরিত্রবয়সউল্লেখযোগ্য ঘটনা
২০১৬আম-কাঁঠালের ছুটিমইন্না১৩প্রথমবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো
২০২৩আম-কাঁঠালের ছুটিমইন্না২০জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন

২০১৬ সালে নির্মাতা মোহাম্মদ নূরুজ্জামানের সিনেমায় লিয়ন ডানপিটে কিশোর ‘মইন্না’ চরিত্রে অভিনয় করেন। প্রথমবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো ভয়ের সঙ্গে অজ্ঞানতার মিশ্রণ ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে চরিত্রের সঙ্গে মিলিত হয়ে পর্দার মইন্না হয়ে ওঠেন। দর্শকের ভালোবাসা পান, তবে বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জের কারণে সিনেমার আলো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। পড়াশোনা থেমে যায়, ছোট ভাইয়ের দায়িত্ব কাঁধে আসে। নৈশবিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণির বেশি পড়তে পারেননি।

২০২৪ সালে মেরিল–প্রথম আলো পুরস্কারের মনোনয়ন খবর ছড়িয়ে পড়ে, তবে লিয়নের খোঁজ মেলেনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্মাতার অনুসন্ধান শেষপর্যন্ত তার এক ফুফুর মাধ্যমে সফল হয়। ২০২৪ সালের ২৪ মে ঢাকার ইউনাইটেড কনভেনশন সেন্টারে লিয়নের নাম ঘোষণা হয়। শহীদুজ্জামান সেলিম ও নাসির উদ্দিন খানের মতো প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের পেছনে ফেলে শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পীর পুরস্কার ওঠে তার হাতে। উপস্থাপক হানিফ সংকেত মঞ্চে বলেন, “অনেকেই পুরস্কারের পেছনে ছোটে, আবার কেউ আছে যাঁদের পুরস্কারই খুঁজে বেড়ায়। লিয়ন আহমেদ তাদের একজন।”

পুরস্কার হাতে পাওয়া লিয়ন বোর্ডবাজারে ফিরে এসেছে, তবে এবার চোখে নতুন স্বপ্ন। পড়াশোনা করতে চান এবং জীবনের কঠিন অধ্যায় পেরিয়ে নতুন করে শুরু করার সাহস পেয়েছেন। মইন্না চরিত্র হয়তো পর্দার, কিন্তু লিয়নের জীবন বাস্তবের এক শক্তিশালী সিনেমা—সংগ্রাম, হারানো আর ফিরে আসার গল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে।