কুমিল্লার একটি এসএসসি পরীক্ষাকেন্দ্রে পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে ফেসবুক লাইভ করার অভিযোগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কুমিল্লা-২ (হোমনা-তিতাস) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া শিক্ষামন্ত্রীর পূর্বনির্দেশনা উপেক্ষা করে পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশ করেন এবং সেখান থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার (লাইভ) চালান। ঘটনাটি পাবলিক পরীক্ষা আইন, ১৯৮০-এর প্রয়োগ ও কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
উক্ত আইনে স্পষ্টভাবে বলা আছে, পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি পরীক্ষাকক্ষে প্রবেশ করতে পারবেন না। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, মঙ্গলবার সকালে হোমনা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে এমপি সেলিম ভূঁইয়া প্রবেশ করেন এবং প্রায় ৯ মিনিট ধরে ফেসবুক লাইভ করেন। ওই সময় তিনি একাধিক পরীক্ষাকক্ষে প্রবেশ করে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন, প্রশ্নপত্র সহজ হয়েছে কি না তা জানতে চান এবং কিছু মন্তব্য করেন, যা পরীক্ষার পরিবেশে অস্বস্তি সৃষ্টি করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনার সময়রেখা
| সময়/পর্যায় | ঘটনা |
|---|---|
| সকাল ১০:১০ | এমপি সেলিম ভূঁইয়া ফেসবুক লাইভ শুরু করেন |
| প্রথম অংশ | একাধিক পরীক্ষাকক্ষে প্রবেশ ও পর্যবেক্ষণ |
| মধ্যবর্তী সময় | পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলা ও মন্তব্য প্রদান |
| মোট সময়কাল | প্রায় ৯ মিনিট লাইভ সম্প্রচার |
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর শিক্ষা প্রশাসনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি প্রফেসর ড. খন্দোকার এহসানুল কবির বলেন, শিক্ষামন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে কোনো জনপ্রতিনিধি পরীক্ষাকেন্দ্রে গিয়ে পরীক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পরিবেশে বিঘ্ন ঘটাতে পারবেন না। তিনি আরও জানান, বিষয়টি ইতোমধ্যে শিক্ষামন্ত্রীর কাছে জানানো হয়েছে এবং ভবিষ্যৎ পরীক্ষার জন্য আরও স্পষ্ট নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক রুনা নাছরীন বলেন, তিনি বিষয়টি মূলত গণমাধ্যমে প্রকাশের পর জানতে পারেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পরীক্ষাকেন্দ্রে সাধারণভাবে শুধু কেন্দ্রসচিব ও অনুমোদিত কর্মকর্তারাই প্রবেশ করতে পারেন। বোর্ডের মনিটরিং টিম থাকলে তারা নির্দিষ্ট প্রটোকল মেনে পরিদর্শন করে থাকে। তবে কোনো ধরনের লাইভ সম্প্রচার বা পরীক্ষার পরিবেশ ব্যাহত করে এমন কর্মকাণ্ড নীতিগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এর আগে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এক সভায় স্পষ্টভাবে জানান, পরীক্ষাকেন্দ্রে স্থানীয় সংসদ সদস্যরা কোনো ধরনের সঙ্গী-সাথী নিয়ে প্রবেশ করতে পারবেন না এবং পরীক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পরিবেশে কোনো হস্তক্ষেপ করা যাবে না। এই নির্দেশনার পরও ঘটনাটি ঘটায় প্রশাসনিক মহলে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রধান নীতিগত দিকসমূহ
- পরীক্ষাকেন্দ্রে অননুমোদিত প্রবেশ আইনত নিষিদ্ধ
- পরীক্ষার গোপনীয়তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা বাধ্যতামূলক
- পরীক্ষাকক্ষে লাইভ সম্প্রচার বা মিডিয়া কার্যক্রম নিষিদ্ধ
- জনপ্রতিনিধির পরিদর্শন নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় সীমিত
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। একাংশ এটিকে পরীক্ষার শৃঙ্খলা ভঙ্গ হিসেবে দেখছে, অন্যদিকে কেউ কেউ প্রশাসনিক নির্দেশনার প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়াকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য দেননি।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, পাবলিক পরীক্ষা একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রক্রিয়া, যেখানে সামান্য ব্যাঘাতও পরীক্ষার্থীদের মানসিক চাপ বাড়াতে পারে এবং পুরো ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। তাই এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কঠোর নজরদারি, স্পষ্ট প্রটোকল এবং আইন প্রয়োগে আরও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
সার্বিকভাবে এই ঘটনা শুধু একটি কেন্দ্রের শৃঙ্খলা ভঙ্গ নয়, বরং দেশের পাবলিক পরীক্ষা ব্যবস্থার প্রশাসনিক সীমারেখা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং নীতিগত বাস্তবায়ন নিয়ে গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
