পরিত্যক্ত শিশু মোরশেদের মৃত্যু: মরদেহ যাচ্ছে মানিকছড়িতে।

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় কনকনে শীতের রাতে মহাসড়কের পাশে অসহায়ভাবে পড়ে থাকা দুই ভাইবোনের সেই করুণ কাহিনীর সমাপ্তি ঘটল অত্যন্ত বেদনাদায়কভাবে। জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে কয়েক দিন লড়াই করার পর অবশেষে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে দুই বছর বয়সী শিশু মোরশেদ। সোমবার (৫ জানুয়ারি) দুপুর আড়াইটার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। অভিভাবকের পরম মমতার বদলে হাড়কাঁপানো শীত আর অবহেলার শিকার হওয়া এই নিষ্পাপ শিশুটির চলে যাওয়া পুরো এলাকার মানুষকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত ২৮ ডিসেম্বর গভীর রাতে, যখন পিএবি সড়কের নির্জন পাশ থেকে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় শিশু দুটিকে উদ্ধার করেন মহিম নামে এক সহৃদয় সিএনজি চালক। শিশু দুটির এই অমানবিক পরিণতির কথা জানাজানি হলে মানবিক দিক বিবেচনায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসন তাদের চিকিৎসার যাবতীয় দায়িত্ব গ্রহণ করে। মোরশেদ ও তার বড় বোনকে যথাযথ যত্নে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও মোরশেদের শারীরিক অবস্থা প্রথম থেকেই ছিল শঙ্কাজনক। দীর্ঘ সময় খোলা আকাশের নিচে শীতে পড়ে থাকায় তার ফুসফুসে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।

শিশু উদ্ধার এবং এই মর্মান্তিক পরিণতির পেছনের তথ্যাবলি নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো:

শিশু মোরশেদ উদ্ধার ও মৃত্যু সংক্রান্ত তথ্যচিত্র

বিষয়তথ্যের বিবরণ
নিহতের নাম ও বয়সমোরশেদ (০২ বছর)
উদ্ধারের তারিখ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫
উদ্ধারকারীমহিম (সিএনজি চালক)
মৃত্যুর স্থান ও সময়চমেক হাসপাতাল আইসিইউ, ৫ জানুয়ারি (দুপুর ২:৩০)
পৈত্রিক নিবাসমহামনি এলাকা, মানিকছড়ি, খাগড়াছড়ি
পিতার বর্তমান অবস্থাগ্রেপ্তারকৃত এবং বর্তমানে জেল হাজতে
মাতার বর্তমান অবস্থাএখনও নিখোঁজ (পুলিশি অনুসন্ধান চলছে)

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শিশুটির পিতা খোরশেদ আলমকে ইতিমধ্যে বাঁশখালী থেকে আটক করেছে পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি পারিবারিক কলহের জেরে শিশুদের ফেলে আসার কথা স্বীকার করেছেন। শিশুদের মা কোথায় আছেন তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বর্তমানে শিশু মোরশেদের বৃদ্ধ দাদি পারভীন আক্তার হাসপাতালে রয়েছেন এবং তিনি তার নাতির মরদেহ নিয়ে নিজ গ্রাম খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। মোরশেদ চলে গেলেও তার বড় বোনটি এখনো চিকিৎসাধীন এবং তার ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মুখে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার জানিয়েছেন যে, মোরশেদের মরদেহ মানিকছড়িতে পাঠানোর যাবতীয় ব্যবস্থা সম্পন্ন করা হয়েছে। বেঁচে থাকা মেয়ে শিশুটির দায়িত্ব তার দাদি নিতে চাইলে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাকে হস্তান্তর করা হবে। অন্যথায় সরকারি কোনো শিশু নিবাসে তার আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হবে। পারিবারিক অশান্তি ও মানবিকতার চরম বিপর্যয়ের এই ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দিল যে, বড়দের ভুলের চড়া মূল্য দিতে হয় নিরপরাধ শিশুদের। মোরশেদের এই অকাল মৃত্যু কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের এক করুণ আর্তনাদ।