পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও বাজারে অস্থিরতার নেপথ্য কারণ

পবিত্র রমজান মাস রহমত ও বরকতের মাস হলেও বাংলাদেশের সাধারণ ক্রেতাদের জন্য এটি যেন অগ্নিমূল্যের মাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস ও সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকদের তথ্য অনুযায়ী, এবার রমজান উপলক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেশি হয়েছে। পাইকারি বাজারগুলোতেও পণ্যের কোনো ঘাটতি নেই, বরং আড়তগুলো মালামালে ঠাসা। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও খুচরা বাজারে পণ্যের দাম কেন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

আমদানির প্রকৃত চিত্র বনাম বাজার দর

বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে ভোগ্যপণ্যের বাজার নির্দিষ্ট কিছু সিন্ডিকেটের কবজায় ছিল। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় সেই একচেটিয়া আধিপত্য ভেঙে আমদানিকারকের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। কাস্টমসের পরিসংখ্যান বলছে, প্রায় প্রতিটি প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। নিচে গত বছরের তুলনায় প্রধান প্রধান ভোগ্যপণ্যের আমদানির একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:

পণ্যের নামআমদানির পরিমাণ/বৃদ্ধিগত বছরের তুলনায় তুলনামূলক চিত্র
চিনি৪ লাখ ৭৩ হাজার টন৩৯% বেশি আমদানি হয়েছে
মসুর ডাল২ লাখ ২৯ হাজার টনপর্যাপ্ত মজুদ ও সরবরাহ স্বাভাবিক
ছোলাচাহিদার ১২৮%চাহিদার তুলনায় ২৮.২৯% বেশি আমদানি
ভোজ্যতেলকয়েক গুণ বৃদ্ধিসরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো দৃশ্যমান ঘাটতি নেই
অন্যান্যখেজুর, পেঁয়াজ, রসুনআমদানির পরিমাণ গতবারের চেয়ে অনেক বেশি

কেন এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি?

সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকা সত্ত্বেও খুচরা বাজারে ‘আগুন’ লাগার পেছনে বেশ কিছু গভীর ও কাঠামোগত কারণ বিদ্যমান বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

১. কৃত্রিম সংকট ও ‘উইথহোল্ডিং সাপ্লাই স্ট্র্যাটেজি’:

অর্থনীতিতে একটি বহুল আলোচিত ধারণা হলো সরবরাহ আটকে রাখা। অনেক ক্ষেত্রে আমদানিকারক বা বড় পাইকাররা পণ্য বন্দরে আসার পরও ইচ্ছাকৃতভাবে খালাসে ধীরগতি দেখান কিংবা গুদামে মজুদ করে রাখেন। বাজারে একটি মনস্তাত্ত্বিক অভাব তৈরি করা হয় যে ‘পণ্য কম আসছে’। এই গুজবের ওপর ভর করে খুচরা বিক্রেতারা দাম বাড়িয়ে দেন। উন্নত বিশ্বে একে ‘কার্টেল’ বা সিন্ডিকেট বলা হয় এবং এটি কঠোরভাবে দণ্ডনীয় অপরাধ।

২. চাঁদাবাজি ও লেনদেন ব্যয়ের বিকৃতি:

পণ্যবাহী ট্রাক বন্দর থেকে মোকামে পৌঁছানো পর্যন্ত পথে পথে অনানুষ্ঠানিক অর্থ আদায় বা চাঁদাবাজির শিকার হয়। এই বাড়তি খরচ যাকে অর্থনীতির ভাষায় ‘ট্রানজ্যাকশন কস্ট ডিসটরশন’ বলা হয়, তা সরাসরি খুচরা মূল্যের ওপর প্রভাব ফেলে। সাধারণ ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে পরিবহন শ্রমিকদের এই ব্যয় বহন করতে হয়, যার চূড়ান্ত ভার পড়ে সাধারণ ক্রেতার পকেটে।

৩. তদারকির অভাব ও নীরবতার সংস্কৃতি:

পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে সরকারি সংস্থার কার্যকর তদারকির ঘাটতি রয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান সাময়িক প্রভাব ফেললেও তা দীর্ঘমেয়াদী সমাধান দিতে পারছে না। অন্যদিকে, প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের ভয়ে অনেক ছোট ব্যবসায়ী সত্য কথা বলতে সাহস পান না, যার ফলে এক ধরনের নীরবতার সংস্কৃতি বাজারকে গ্রাস করে ফেলেছে।

৪. নৈতিকতার অবক্ষয়:

রমজানের পবিত্রতাকে পুঁজি করে এক শ্রেণির সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ী অধিক মুনাফা অর্জনে লিপ্ত হন। বিশেষ করে ইফতার সামগ্রীর জন্য প্রয়োজনীয় দেশীয় সবজি যেমন—বেগুন, শসা, লেবু ও ধনেপাতার দাম কোনো কারণ ছাড়াই বাড়িয়ে দেওয়া হয়। যেহেতু এগুলো পচনশীল এবং দেশেই উৎপাদিত হয়, তাই এখানে আমদানির অজুহাত দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

উত্তরণের উপায় ও করণীয়

বাজারের এই অস্থিরতা কমাতে শুধু অভিযান পরিচালনা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সমন্বিত ও ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা।

  • তথ্য উন্মুক্তকরণ: প্রতিদিন কী পরিমাণ পণ্য আমদানি হচ্ছে এবং কোন গুদামে কতটুকু মজুদ আছে, তা ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে জনসাধারণের কাছে প্রকাশ করতে হবে।

  • চাঁদাবাজি বন্ধ: হাইওয়ে ও পাইকারি বাজারে অনানুষ্ঠানিক অর্থ আদায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হবে।

  • প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা: আমদানিকারকের সংখ্যা আরও বাড়িয়ে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের পণ্য আমদানিতে বিশেষ সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন।

  • জনসচেতনতা: ভোক্তাদেরও অহেতুক পণ্য মজুদ করার প্রবণতা পরিহার করতে হবে।

পরিশেষে, বাজার কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি জনগণের জীবনযাত্রার অপরিহার্য অংশ। ব্যবসা মুনাফাভিত্তিক হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলা চরম অনৈতিক ও সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য। সরকারের পাশাপাশি ব্যবসায়ী সমাজেরও নৈতিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।