পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা: কর্ণফুলী নদীতে লাইটার জাহাজের সংকট

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর থেকে পণ্য খালাস করে কর্ণফুলী নদীতে মাসের পর মাস অলস বসে থাকছে অসংখ্য লাইটার জাহাজ। বিশেষ করে খাদ্যশস্য আমদানির ক্ষেত্রে আমদানিকারকদের অনীহা ও সময়মতো পণ্য খালাস না করার কারণে নদীপথে জাহাজজট প্রকট আকার ধারণ করেছে। আজ বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের এক বিশেষ অভিযানে এই চিত্র উঠে আসে। বন্দরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাদিয়া আফরিনের নেতৃত্বে ‘দিশারী-৬’ নামক পাইলট জাহাজে চড়ে কর্ণফুলী নদীর সদরঘাট এলাকায় এই ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করা হয়।

৩৪ দিন ধরে ভাসমান ১,৯০০ টন গম

অভিযান চলাকালীন ‘এমভি আল আসওয়াদ-২’ নামক একটি লাইটার জাহাজে তল্লাশি চালিয়ে দেখা যায়, জাহাজটি দীর্ঘ ৩৪ দিন ধরে গম বোঝাই অবস্থায় নদীতে নোঙর করে আছে। জাহাজের মাস্টার নজরুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, “গত ২৫ ডিসেম্বর সাগর থেকে ১ হাজার ৯০০ টন গম নিয়ে আমরা এখানে এসেছি। আমদানিকারক পক্ষ থেকে খালাসের কোনো সংকেত না আসায় আমাদের কিছুই করার নেই। কবে নাগাদ এই মালামাল নামানো হবে, তা আমাদের জানা নেই।”

একই অবস্থা দেখা গেছে পাশের ‘এমভি আল-ওয়াহাব’ জাহাজেও। ৩১ ডিসেম্বর থেকে ২ হাজার ৪০০ টন গম নিয়ে বসে থাকা এই জাহাজটিকে এর আগেও ১৫ জানুয়ারি ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছিল। তবুও আমদানিকারকের অনীহায় পণ্য খালাসে কোনো অগ্রগতি হয়নি।

সারণি: অভিযানে চিহ্নিত উল্লেখযোগ্য জাহাজের তথ্য ও বর্তমান অবস্থা

জাহাজের নামপণ্যের ধরণ ও পরিমাণঅবস্থানের সময়কালবর্তমান অবস্থা ও দণ্ড
এমভি আল আসওয়াদ-২১,৯০০ টন গম৩৪ দিন (২৫ ডিসেম্বর থেকে)সতর্কীকরণ ও আইনি নোটিশ
এমভি আল-ওয়াহাব২,৪০০ টন গম২৯ দিন (৩১ ডিসেম্বর থেকে)জরিমানা ও কঠোর সর্তকতা
সামগ্রিক অভিযানবিবিধ খাদ্যশস্য১৫ – ৪০ দিনমোট ৯টি জাহাজকে জরিমানা

কৃত্রিম সংকট তৈরির অপচেষ্টা ও প্রশাসনিক কঠোরতা

বন্দর কর্তৃপক্ষের নিয়ম অনুযায়ী, বহির্নোঙরে বড় জাহাজ (মাদার ভ্যাসেল) থেকে লাইটার জাহাজে পণ্য স্থানান্তরের পর সর্বোচ্চ তিন দিনের মধ্যে তা খালাস করার বিধান রয়েছে। কিন্তু অভিযানে দেখা গেছে, আমদানিকারকরা লাইটার জাহাজগুলোকে এক প্রকার ‘ভাসমান গুদাম’ হিসেবে ব্যবহার করছেন। বন্দরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাদিয়া আফরিন জানান, কোনো অসাধু চক্র যাতে আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে, সেজন্য এই অভিযান চালানো হচ্ছে। আমদানিকারকরা মালামাল খালাস না করে বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে দাম বাড়ানোর কৌশল হিসেবে এই দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

অভিযানে প্রাপ্ত জরিমানা ও পরবর্তী পদক্ষেপ

বৃহস্পতিবারের দিনভর অভিযানে আইন লঙ্ঘন করে দীর্ঘ সময় নদী দখল করে থাকায় ৯টি লাইটার জাহাজকে মোট ২ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। বন্দরের উপপরিচালক (নিরাপত্তা) লে. কমান্ডার সৈয়দ সাজ্জাদুর রহমান জানান, লাইটার জাহাজে পণ্য মজুত রাখা কেবল নিয়মবহির্ভূতই নয়, এটি বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রমকেও ব্যাহত করছে। নদীর নাব্যতা ও জাহাজ চলাচলের পথ সুগম রাখতে এবং নিত্যপণ্যের সরবরাহ চেইন ঠিক রাখতে এ ধরনের সাঁড়াশি অভিযান নিয়মিত পরিচালিত হবে।

অভিযান শেষে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পুনরায় হুশিয়ারি দেন যে, জরিমানার পরেও যদি দ্রুত পণ্য খালাস না করা হয়, তবে সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক ও জাহাজ মালিকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র এই বন্দরকে জটমুক্ত রাখতে সকল পক্ষকে নিয়ম মেনে মালামাল খালাসের আহ্বান জানানো হয়েছে।