সমাজে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য ও সহিংসতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম কেবল জনপরিসর বা কর্মক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়; পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবনের ভেতরেও এ বিষয়ে সচেতনতা ও প্রতিবাদ জরুরি। বিশিষ্ট আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী ব্যারিস্টার সারা হোসেন মনে করেন, পরিবারে ঘটে যাওয়া বৈষম্য, হয়রানি ও নির্যাতনের ঘটনাগুলো নিয়ে মানুষের নীরবতাই সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি করছে। তিনি বলেন, ঘরের ভেতরে যে ধরনের বৈষম্য বা সহিংসতা ঘটে, সেগুলো নিয়ে সমাজে খুব কমই আলোচনা হয়। ফলে সমস্যাগুলো দীর্ঘদিন অদৃশ্য থেকে যায় এবং ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে জাতীয় প্রেস ক্লাবে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। “আক্রমণ, বিদ্বেষ, আধিপত্যের বিরুদ্ধে নারীর সংগ্রাম ও আগামীর বাংলাদেশ” শীর্ষক এ আলোচনা সভায় বিভিন্ন পেশার নারী নেতৃবৃন্দ ও গবেষকেরা অংশ নেন এবং নারী অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে তাঁদের মতামত তুলে ধরেন।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্যকলা বিভাগের শিক্ষক দীপ্তি দত্ত। তিনি বলেন, দেশে নারীর প্রতি সহিংসতা, যৌন হয়রানি এবং সামাজিক বিদ্বেষের ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এসব ঘটনার পেছনে যে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে, সেগুলো বিশ্লেষণ করা জরুরি। তাঁর মতে, পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা, আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং সামাজিক নীরবতার কারণে অনেক অপরাধই শাস্তিহীন থেকে যায়।
কমরেড জলি তালুকদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় আরও বক্তব্য দেন ডা. অধ্যাপক আক্তার বানু, কমরেড লাকি আক্তার এবং মমতা চক্রবর্তী। বক্তারা বলেন, দেশে রাজনৈতিক পালাবদল হলেও নারীর ওপর সহিংসতা ও বৈষম্যের চিত্রে বড় পরিবর্তন দেখা যায় না। এ প্রসঙ্গে সারা হোসেন বলেন, “দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলালেও নারীদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক রাজনীতি বন্ধ হয়নি। কোনো রাজনৈতিক দল বা মতাদর্শের নারীর ওপর সহিংসতা আমরা দেখতে চাই না।”
কমরেড লাকি আক্তার তাঁর বক্তব্যে বলেন, কিছু উগ্রপন্থি গোষ্ঠী নারীদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে দেওয়ার মতো প্রস্তাব তুলে ধরছে, যা নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে সীমিত করতে পারে। তিনি বলেন, নারীদের জন্য সমান মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং কর্মক্ষেত্রে মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি।
সিপিবি ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নারীবিষয়ক সম্পাদক মমতা চক্রবর্তী বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা শাস্তি না পাওয়ায় ভুক্তভোগীরা অভিযোগ জানাতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।
এদিকে একই দিনে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে নারী সংহতি “রূপান্তরের প্রত্যাশা: নারীর নাগরিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা” শীর্ষক এক মুক্ত আলোচনার আয়োজন করে। সেখানে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নারীদের অবস্থার উন্নতির প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে সেই পরিবর্তন খুব বেশি দৃশ্যমান নয়। তিনি মনে করেন, নারীর নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা ও সামাজিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হলে রাষ্ট্র ও সমাজকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।
বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের সামগ্রিক চিত্র বোঝাতে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন বক্তারা। উদাহরণ হিসেবে সাম্প্রতিক বছরগুলোর কিছু পরিসংখ্যান নিচে তুলে ধরা হলো।
| সূচক | সাম্প্রতিক চিত্র |
|---|---|
| পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারী | উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে এ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন |
| কর্মক্ষেত্রে হয়রানি | বিভিন্ন জরিপে বহু নারী কর্মক্ষেত্রে মানসিক বা যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছেন |
| বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা | অনেক মামলায় দীর্ঘ সময় ধরে বিচার ঝুলে থাকার অভিযোগ রয়েছে |
আলোচনায় বক্তারা একমত হন যে, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও রাষ্ট্র—সব ক্ষেত্রেই নারীর সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হলে নীরবতা ভাঙা এবং সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি।
