বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র নতুন সরকারকে সামনে রেখে ঢাকা–ওয়াশিংটন সম্পর্ক নতুনভাবে সাজাতে তৎপর হয়ে উঠেছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, নির্বাচন-পরবর্তী বাস্তবতায় বাংলাদেশকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল, অগ্রাধিকার ও নীতিগত অবস্থান আরও স্পষ্ট ও গভীর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আগামী মার্চের প্রথম সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস পল কাপুরের ঢাকা সফরের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা দুই দেশের সম্পর্কে একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় সূচনা করতে পারে।
জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন সম্প্রতি পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন এবং পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামের সঙ্গে বৈঠকে কাপুরের সম্ভাব্য সফরের বিষয়টি উত্থাপন করেন। কূটনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে, ৬ থেকে ৯ মার্চের মধ্যে কাপুর ঢাকা সফরে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। সফরটি বাস্তবায়িত হলে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি হবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অন্যতম প্রথম উচ্চপর্যায়ের সরাসরি কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা, যা ওয়াশিংটনের আগ্রহ ও তৎপরতার স্পষ্ট বার্তা বহন করবে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন গত বছর ফেব্রুয়ারিতে ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক এস পল কাপুরকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে মনোনয়ন দেয়। পরে মার্কিন সিনেটের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির অনুমোদন পেয়ে অক্টোবরে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ পুনর্গঠনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, নিরাপত্তা অংশীদারত্ব এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা—এই তিনটি বিষয়ই সমান গুরুত্ব পাচ্ছে।
সিনেটের অনুমোদন শুনানিতে কাপুর বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। ভারতের পর বাংলাদেশ অঞ্চলটির অন্যতম বড় অর্থনীতি—এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, বাণিজ্য, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও কৌশলগত সহযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। বিশেষ করে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণকে তিনি তাঁর অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে রাখার কথা স্পষ্ট করেন।
এই অবস্থান ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন বিভিন্ন সময় চীনের সঙ্গে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে বাংলাদেশকে সেই প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। মার্কিন সিনেটে গৃহীত কিছু আইন ও হালনাগাদ জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের পরিপ্রেক্ষিতে ওয়াশিংটনের দৃষ্টিভঙ্গি আরও কঠোর হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। ফলে কাপুরের সম্ভাব্য সফরে চীন প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নতুন সরকারের কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিষয়ে দীর্ঘদিনের গবেষক হিসেবে কাপুরের একাডেমিক ও নীতিনির্ধারণী অভিজ্ঞতা তাঁকে এই অঞ্চলের জন্য উপযোগী করে তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বৈত অভিজ্ঞতা তাঁকে জটিল আঞ্চলিক বাস্তবতা অনুধাবনে ও কৌশলগত সিদ্ধান্তে বাড়তি সক্ষমতা দেয়।
নিচের টেবিলে এস পল কাপুরের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা হলো—
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| বর্তমান পদ | যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী |
| দায়িত্ব গ্রহণ | গত বছরের অক্টোবর |
| শিক্ষাগত পটভূমি | দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক |
| পূর্ববর্তী দায়িত্ব | মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নীতিনির্ধারণী কর্মকর্তা (২০২০–২১) |
| শিক্ষা | অ্যামহার্স্ট কলেজ থেকে স্নাতক; শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি |
সব মিলিয়ে, এস পল কাপুরের সম্ভাব্য ঢাকা সফর কেবল নিয়মিত কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে উঠতে পারে। বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে আগামী বছরগুলোতে দুই দেশের সহযোগিতার সুর এই সফরেই অনেকটা নির্ধারিত হতে পারে।
