আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অর্থের অবৈধ লেনদেন ও সম্ভাব্য অপব্যবহার রোধে দেশের মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) এবং ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবার ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আজ রোববার কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক জারি করা এক জরুরি প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে, আজ রাত ১২টা থেকে শুরু করে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি রাত ১১টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত মোট ৯৬ ঘণ্টা এই কড়াকড়ি কার্যকর থাকবে। নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে এবং ভোটারদের প্রভাবিত করার মতো আর্থিক অপরাধ ঠেকাতে এই নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
লেনদেনের নতুন সীমা ও সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বিকাশ, রকেট, নগদের মতো জনপ্রিয় এমএফএস সেবা ব্যবহার করে একজন গ্রাহক একবারে ১,০০০ টাকার বেশি পাঠাতে পারবেন না। ব্যক্তিগত পর্যায়ে টাকা পাঠানোর (Person to Person – P2P) ক্ষেত্রে এই সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে দৈনন্দিন জীবনের জরুরি প্রয়োজন মেটানোর জন্য মার্চেন্ট পেমেন্ট (কেনাকাটা) এবং ইউটিলিটি বিল পরিশোধের মতো পরিষেবাগুলো এই বিধিনিষেধের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে।
একনজরে ব্যাংকিং সেবার নতুন নিয়মাবলি:
| সেবার ধরন | বিধিনিষেধ ও লেনদেনের সীমা | সময়সীমা |
| এমএফএস (বিকাশ, নগদ, রকেট) | প্রতি লেনদেনে সর্বোচ্চ ১,০০০ টাকা | ৯৬ ঘণ্টা (৮-১২ ফেব্রুয়ারি) |
| দৈনিক এমএফএস লেনদেন | সর্বোচ্চ ১০ বার (সর্বমোট ১০,০০০ টাকা) | ৯৬ ঘণ্টা (৮-১২ ফেব্রুয়ারি) |
| ইন্টারনেট ব্যাংকিং (IBFT) | ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি লেনদেন সম্পূর্ণ বন্ধ | ৯৬ ঘণ্টা (৮-১২ ফেব্রুয়ারি) |
| মার্চেন্ট ও বিল পেমেন্ট | প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী স্বাভাবিক থাকবে | কোনো পরিবর্তন নেই |
| ব্যাংকিং অ্যাপ সেবা | অ্যাপের মাধ্যমে ফান্ড ট্রান্সফার সাময়িক বন্ধ | ৯৬ ঘণ্টা (৮-১২ ফেব্রুয়ারি) |
নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও জরুরি রেসপন্স সেল
নির্বাচনকালীন এই সময়ে কোনো প্রকার সন্দেহজনক বা অস্বাভাবিক লেনদেন সংঘটিত হচ্ছে কি না, তা যাচাই করতে এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোকে সার্বক্ষণিক নিবিড় পর্যবেক্ষণের (Close Monitoring) নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, প্রতিটি এমএফএস প্রোভাইডারকে একটি নিজস্ব ‘জরুরি রেসপন্স সেল’ গঠন করতে হবে। যদি কোনো আর্থিক অপরাধ বা অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়, তবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে তা তাৎক্ষণিকভাবে নিকটস্থ থানায় রিপোর্ট করতে হবে। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নির্বাচন কমিশনের চাহিদা মোতাবেক প্রয়োজনীয় সকল তথ্য ও সহযোগিতা প্রদানের জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।
গ্রাহক ভোগান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ
হঠাৎ করে ইন্টারনেট ব্যাংকিং এবং ফান্ড ট্রান্সফার সুবিধা সীমিত করায় সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যারা জরুরি প্রয়োজনে বড় অঙ্কের লেনদেনের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এই ৪ দিন বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচনের স্বচ্ছতা রক্ষা এবং কালোটাকার প্রভাব মুক্ত রাখতে এই অস্থায়ী ত্যাগ জনস্বার্থেই জরুরি। ইন্টারনেট ব্যাংকিং তথা ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচের আওতায় আইবিএফটি (IBFT) সেবাটি সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে যাতে বড় অঙ্কের অর্থ এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে দ্রুত স্থানান্তরিত হতে না পারে।
পরিশেষে, ডিজিটাল লেনদেনের এই আধুনিক যুগে নির্বাচনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তির লাগাম টেনে ধরার এই প্রচেষ্টা কতটুকু সফল হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। গ্রাহকদের এই সময়কালে যেকোনো বড় আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে বিকল্প মাধ্যম বা পূর্বপ্রস্তুতি রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
