ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়োজিত আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ভেতরে বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য ফাঁস হয়েছে। রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকায় আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে ৩৩০ জনকে নির্বাচনি ডিউটিতে অন্তর্ভুক্ত করার ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদর দপ্তর থেকে অভিযুক্তদের তাৎক্ষণিক অব্যাহতি প্রদান এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
Table of Contents
হাতিরঝিল ও চট্টগ্রামের জালিয়াতি চক্র
তদন্তে দেখা গেছে, রাজধানীর হাতিরঝিল থানার ২২ নম্বর ওয়ার্ডের শহর প্রতিরক্ষা দলের (টিডিপি) নেতা মামুন এই বিশাল জালিয়াতি চক্রের মূল হোতা। তিনি সম্পূর্ণ প্রশিক্ষণবিহীন ৩৩০ জন ব্যক্তিকে অর্থের বিনিময়ে নির্বাচনি দায়িত্বের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি জনপ্রতি ৪০০ টাকার বিনিময়ে ভুয়া প্রশিক্ষণ সনদ তৈরি করেন এবং পরে নির্বাচনি ডিউটি পাইয়ে দেওয়ার নাম করে জনপ্রতি আরও ১ হাজার ১০০ টাকা করে উৎকোচ গ্রহণ করেন। বাহিনীর নিবিড় তদারকিতে এই দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ৩৩০ জনকেই তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অভিযুক্ত মামুন বর্তমানে পলাতক থাকলেও তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
একইভাবে চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ১৩ জন সদস্যের বিরুদ্ধে ‘প্রশিক্ষণবিহীন’ হওয়ার অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাঁদেরও ডিউটি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আনসার বাহিনীর গৃহীত শাস্তিমূলক ব্যবস্থার চিত্র
| এলাকা/থানা | অভিযুক্তের ধরন/পদবি | অনিয়মের প্রকৃতি | গৃহীত ব্যবস্থা |
| হাতিরঝিল (২২ নং ওয়ার্ড) | ওয়ার্ড দলনেতা মামুন | ৩৩০ জনকে টাকার বিনিময়ে অবৈধ নিয়োগ | ৩৩০ জনকেই অব্যাহতি ও পলাতক নেতার বিরুদ্ধে মামলা |
| চট্টগ্রাম (কোতোয়ালি) | ১৩ জন সাধারণ আনসার | প্রশিক্ষণ ছাড়াই দায়িত্ব গ্রহণ | তাৎক্ষণিক অব্যাহতি |
| গুলশান (১৯ নং ওয়ার্ড) | দলনেত্রী শাহনাজ সুলতানা | বিশেষ রাজনৈতিক দলের সাথে সংশ্লিষ্টতা | দায়িত্ব থেকে অপসারণ |
| ভাটারা (৪০ নং ওয়ার্ড) | দলনেত্রী সামসুন্নাহার | রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের প্রাথমিক সত্যতা | দায়িত্ব থেকে অপসারণ |
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও নিরপেক্ষতার চ্যালেঞ্জ
কেবল আর্থিক দুর্নীতিই নয়, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও কঠোর অবস্থানে রয়েছে বাহিনীটি। রাজধানীর গুলশান ও ভাটারা থানায় দায়িত্বরত দুই নারী দলনেত্রীকে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ এবং পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচনের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ হাসিল রুখতে তাঁরা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন।
নির্বাচনি নিরাপত্তা ও আনসার বাহিনীর প্রস্তুতি
আগামীকালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটারদের নিরাপত্তা ও ভোটকেন্দ্রের শান্তি রক্ষায় সারা দেশে প্রায় সাড়ে ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছেন। এর মধ্যে সিংহভাগই আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্য, যাদের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৫ লাখেরও বেশি।
আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদর দপ্তর থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, নির্বাচনি দায়িত্ব পালনের জন্য শারীরিক সক্ষমতার পাশাপাশি বৈধ প্রশিক্ষণ সনদ ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা থাকা বাধ্যতামূলক। কোনো ভুয়া সনদধারী, অযোগ্য বা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ব্যক্তির মাধ্যমে নির্বাচনকে কোনোভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে দেওয়া হবে না। বাহিনীর প্রতিটি স্তরে কঠোর মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে যাতে কোনো সদস্য ডিউটি চলাকালে নিয়ম ভঙ্গ করতে না পারেন।
