নিরাময়কেন্দ্রে যুবককে অমানবিক নির্যাতন: গাইবান্ধায় থানায় অভিযোগ

গাইবান্ধা শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত একটি মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসনকেন্দ্রে এক মানসিক ভারসাম্যহীন যুবককে দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রেখে অমানবিক শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী যুবকের নাম মুর্শিদ হক্কানী (৩৭)। এই ঘটনায় শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে গাইবান্ধা সদর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন তার বড় ভাই আওরঙ্গ হক্কানী। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জেলাজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

ঘটনার বিবরণ ও নির্যাতনের চিত্র

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ২৮ আগস্ট মুর্শিদ হক্কানী শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে গাইবান্ধা শহরের ভি-এইড রোডে অবস্থিত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গণ উন্নয়ন কেন্দ্র (জিইউকে) পরিচালিত মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসনকেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। ভর্তির শুরুর দিকে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে পরিবারের লোকজনকে তার খোঁজখবর নিতে দেওয়া হলেও, পরবর্তীতে বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে স্বজনদের সাথে মুর্শিদের দেখা-সাক্ষাৎ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

গত ১১ ফেব্রুয়ারি দুপুরে পরিবারের সদস্যরা পুনরায় দেখা করতে চাইলে কেন্দ্রের দায়িত্বরতরা টালবাহানা শুরু করেন। দীর্ঘ সময় অনুরোধের পর বিকেলে মুর্শিদকে স্বজনদের সামনে আনা হয় এবং কর্তৃপক্ষ তাকে আর সেখানে রাখবে না বলে জানিয়ে দেয়। ওই সময় স্বজনরা লক্ষ্য করেন, মুর্শিদের নাকের ওপরসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম ও আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

ভুক্তভোগীর বয়ানে লোমহর্ষক বর্ণনা

কেন্দ্রের পাওনা পরিশোধ করে মুর্শিদকে বাড়িতে নেওয়ার পর তিনি সেখানে কাটানো বিভীষিকাময় সময়ের বর্ণনা দেন। তার ভাষ্যমতে, নিরাময়কেন্দ্রের একটি অন্ধকার ঘরে নিয়ে মুখে কাপড় গুঁজে লোহার রড দিয়ে তার হাত, পা, পিঠ এবং হাঁটুতে উপর্যুপরি আঘাত করা হতো। একপর্যায়ে দুই পা রশি দিয়ে বেঁধে উল্টো করে জানালার গ্রিলে ঝুলিয়ে রেখে তাকে চরম নির্যাতন করা হতো, যার ফলে তিনি একাধিকবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলতেন। বাড়িতে নিয়ে আসার পর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ১১ ফেব্রুয়ারি বিকেলে তাকে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

নিচে অভিযুক্ত পাঁচ ব্যক্তির তালিকা দেওয়া হলো:

অভিযুক্তের নামবয়স (আনুমানিক)পরিচয়
বাঁধন৩৫ বছরদায়িত্বরত কর্মকর্তা
লাবিব৩২ বছরদায়িত্বরত কর্মকর্তা
সিয়াম৩৫ বছরদায়িত্বরত কর্মকর্তা
আতিক৩৬ বছরদায়িত্বরত কর্মকর্তা
তালহা৩৫ বছরদায়িত্বরত কর্মকর্তা

কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া ও আইনি ব্যবস্থা

এ বিষয়ে গণ উন্নয়ন কেন্দ্রের (জিইউকে) প্রধান নির্বাহী এম আবদুস সালামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঘটনার সত্যতা খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেন। নির্যাতনের কিছু ভিডিও ফুটেজ তাকে পাঠানো হলে তিনি দুঃখ প্রকাশ করে জানান যে, বর্তমানে তিনি অসুস্থ হলেও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছেন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গাইবান্ধা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, লিখিত অভিযোগটি প্রাপ্তি সাপেক্ষে তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির ওপর এ ধরনের শারীরিক নির্যাতন আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। তদন্ত শেষে দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ভুক্তভোগী পরিবারটি এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার সুষ্ঠু বিচার এবং নিরাময়কেন্দ্রগুলোর ওপর সরকারি নজরদারি বাড়ানোর জোর দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে, নিরাময়ের নামে এ ধরনের টর্চার সেল বন্ধ হওয়া জরুরি।