নিরাপত্তার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নতুন সম্পর্ক চায় ইউরোপ

জার্মানির মিউনিখে অনুষ্ঠিত বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সম্মেলনে (মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্স) বিশ্ব রাজনীতির এক নতুন মেরুকরণ লক্ষ্য করা গেছে। দীর্ঘদিনের মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইউরোপীয় দেশগুলোর সম্পর্কের টানাপড়েন নিরসনে এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিতে সম্পর্ক ‘পুনর্গঠন’ বা নতুনভাবে গড়ে তোলার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন ইউরোপের শীর্ষ নেতারা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্যের প্রেক্ষাপটে ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্কের মধ্যে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠাই এখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো সদস্যদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মিউনিখ সম্মেলনের মূল গতিধারা ও চ্যান্সেলরের আহ্বান

বার্ষিক এই সম্মেলনে বিশ্বের ৬০টিরও বেশি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। সম্মেলনের মূল সুর বেঁধে দেন স্বাগতিক জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ‘নতুন ট্রান্সআটলান্টিক অংশীদারত্ব’-এর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। চ্যান্সেলরের মতে, ন্যাটো জোটের সংহতি কেবল ইউরোপের জন্যই নয়, বরং খোদ যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও একটি বড় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা। তিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে মার্কিন নেতৃত্বকে আবারও আস্থায় নিতে এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তি মজবুত করার আহ্বান জানান।

প্রতিরক্ষা বাজেট ও স্বাবলম্বী ইউরোপের ডাক

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার ন্যাটোর ইউরোপীয় সদস্যদের প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে আসছেন। মিউনিখেও এই বিষয়টি গুরুত্বের সাথে আলোচিত হয়েছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ স্পষ্ট করেছেন যে, এখন সময় এসেছে একটি ‘শক্তিশালী ও সার্বভৌম ইউরোপ’ গড়ে তোলার। অন্যদিকে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ইউরোপকে একটি ‘ঘুমন্ত দৈত্য’ হিসেবে অভিহিত করে প্রতিরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর তাগিদ দিয়েছেন।

ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুতেও এই পরিবর্তনের সুরকে সমর্থন করে জানিয়েছেন যে, ইউরোপ এখন ন্যাটোর ভেতর অধিকতর নেতৃত্ব দিচ্ছে এবং নিজেদের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব গ্রহণে আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেষ্ট।

নিচে সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের অবস্থান ও মূল বার্তা একটি টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:

দেশের নাম/নেতাপ্রধান বক্তব্য ও অবস্থানলক্ষ্যমাত্রা
জার্মানি (ফ্রিডরিখ মের্ৎস)নতুন ট্রান্সআটলান্টিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে আস্থা পুনরুদ্ধার।ন্যাটোর সংহতি রক্ষা।
ফ্রান্স (এমানুয়েল মাখোঁ)ইউরোপকে সামরিক ও কৌশলগতভাবে আরও শক্তিশালী করা।সার্বভৌম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
যুক্তরাজ্য (কিয়ার স্টারমার)প্রতিরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা হ্রাস করা।‘ঘুমন্ত দৈত্য’ জাগ্রত করা।
ন্যাটো (মার্ক রুতে)ইউরোপের ক্রমবর্ধমান নেতৃত্ব ও দায়িত্ব গ্রহণকে স্বাগত জানানো।ট্রান্সআটলান্টিক বন্ধন দৃঢ় করা।
চীন (ওয়াং ই)সংঘাতের বদলে সংলাপ ও দ্বন্দ্বের বদলে সহযোগিতার পথ।বিশ্বশান্তি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কূটনৈতিক তৎপরতা

সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করেন। তিনি জার্মান চ্যান্সেলরের সাথে একান্ত বৈঠকে ইউক্রেন যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি এবং রাশিয়ার সাথে সম্ভাব্য আলোচনার প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করেন। এছাড়া তিনি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর সাথেও বৈঠক করেন। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে সংঘাত এড়িয়ে সহযোগিতার নীতি অনুসরণের ওপর জোর দেন, যা বৈশ্বিক উত্তেজনার মাঝে এক ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

পরিশেষে বলা যায়, মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলন ২০২৬-এর মূল বার্তাটি অত্যন্ত পরিষ্কার—ইউরোপ আর কেবল যুক্তরাষ্ট্রের ছায়াতলে থাকতে চায় না, বরং তারা অংশীদারত্বের ভিত্তিতে একটি শক্তিশালী ও সমানুপাতিক সম্পর্ক চায়। রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান হুমকি এবং বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার এই যুগে ট্রান্সআটলান্টিক আস্থার পুনরুদ্ধারই হতে পারে বিশ্বশান্তির চাবিকাঠি।