কণ্ঠশিল্পী মোঃ আব্দুল জব্বার—একটি নাম নয়, একটি অধ্যায়; একটি কণ্ঠ নয়, একটি যুগ। বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে তিনি শুধু জনপ্রিয়তার শিখরে আরোহনকারী শিল্পীই নন, বরং বাঙালির সংগ্রাম, প্রেম, বেদনা ও আত্মপরিচয়ের এক অনন্য প্রতীক। তাঁর দরাজ, গভীর ও আবেগময় কণ্ঠ বহু আহত হৃদয়ে যুগিয়েছে স্বস্তি, বহু নিঃশ্বাসে ফিরিয়েছে সাহস। চলচ্চিত্রের রূপালি পর্দায় বিরহ, আত্মসংগ্রাম কিংবা বেদনাঘন মুহূর্তে তাঁর কণ্ঠ যেন দৃশ্যকে নতুন প্রাণ দিত, গল্পকে করে তুলত আরও বিশ্বাসযোগ্য।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত তাঁর গাওয়া ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’, ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’সহ অসংখ্য উদ্দীপনামূলক গান তাঁকে পরিণত করে সংগ্রামী জাতির কণ্ঠস্বরে। এসব গান শুধু বিনোদন ছিল না; ছিল প্রেরণা, ছিল অস্ত্র—যা মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল দৃঢ় করেছিল এবং দেশবাসীর মধ্যে জাগিয়ে তুলেছিল স্বাধীনতার অদম্য আকাঙ্ক্ষা। এই অবদানের ফলেই তিনি ইতিহাসে পেয়েছেন স্থায়ী আসন।
তাঁর কণ্ঠে গাওয়া ‘তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়’, ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ ও ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’—এই তিনটি গান ২০০৬ সালের মার্চে বিবিসি বাংলার শ্রোতাদের ভোটে সর্বকালের সেরা ২০টি বাংলা গানের তালিকায় স্থান পায়, যা তাঁর শিল্পমান ও জনপ্রিয়তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
বাংলা সঙ্গীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মোঃ আব্দুল জব্বার ১৯৮০ সালে একুশে পদক এবং ১৯৯৬ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন—যা একজন শিল্পীর জন্য রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মানের প্রতিফলন।
Table of Contents
জন্ম ও সংগীতজীবনের সূচনা
তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি, কুষ্টিয়া জেলায়। ১৯৫৬ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর সংগীতে আনুষ্ঠানিক তালিম নেন ওস্তাদ ওসমান গনি ও ওস্তাদ লুৎফুল হকের কাছে। ১৯৫৮ সাল থেকে তিনি তৎকালীন পাকিস্তান বেতারে তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবে যুক্ত হন। ১৯৬২ সালে চলচ্চিত্রে প্রথম নেপথ্য কণ্ঠ দেন এবং ১৯৬৪ সাল থেকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের নিয়মিত শিল্পী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। একই বছরে জহির রায়হান পরিচালিত পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র ‘সংগম’-এ নেপথ্য কণ্ঠ দেন তিনি।
কালজয়ী গান ও চলচ্চিত্র
১৯৬৮ সালে ‘এতটুকু আশা’ ছবিতে সত্য সাহার সুরে গাওয়া ‘তুমি কি দেখেছ কভু’ আজও শ্রোতাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। ‘ঢেউয়ের পর ঢেউ’-এ ‘সুচরিতা যেও নাকো আরও কিছুক্ষণ থাকো’, ‘পিচ ঢালা পথ’-এ ‘পিচ ঢালা এই পথটারে ভালবেসেছি’, ‘নাচের পুতুল’-এর শিরোনাম গান ‘মানুষ তো নয় নাচের পুতুল’—সবগুলোই বাংলা চলচ্চিত্র সঙ্গীতের অনন্য সম্পদ। ১৯৭৮ সালে ‘সারেং বৌ’ চলচ্চিত্রে আলম খানের সুরে গাওয়া ‘ওরে নীল দরিয়া’ তাঁকে নতুন প্রজন্মের কাছেও অমর করে তোলে।
মৌলিক গান ও ব্যক্তিজীবন
গোলাম সারোয়ারের সুর ও সংগীত পরিচালনায় প্রকাশিত তাঁর একমাত্র মৌলিক অ্যালবাম ‘কোথায় আমার নীল দরিয়া’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর স্ত্রী ছিলেন গীতিকার শাহীন জব্বার; তাঁদের সন্তান মিথুন জব্বারও সংগীতাঙ্গনে যুক্ত।
মুক্তিযুদ্ধে অবিস্মরণীয় অবদান
মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি কেবল কণ্ঠেই নয়, কর্ম ও ত্যাগেও সক্রিয় ছিলেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে মুম্বইয়ে জনমত গঠনে কাজ করেন, কলকাতার মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে গণসঙ্গীত পরিবেশন করে মনোবল জোগান। এ সময় সংগীত পরিবেশন থেকে প্রাপ্ত ১২ লাখ রুপি তিনি স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের ত্রাণ তহবিলে দান করেন—যা তাঁর দেশপ্রেমের উজ্জ্বল নিদর্শন।
সংক্ষিপ্ত তথ্যছক
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| জন্ম | ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৮, কুষ্টিয়া |
| সংগীত শিক্ষা | ওস্তাদ ওসমান গনি, ওস্তাদ লুৎফুল হক |
| পেশাগত সূচনা | ১৯৫৮, পাকিস্তান বেতার |
| উল্লেখযোগ্য গান | সালাম সালাম হাজার সালাম, জয় বাংলা বাংলার জয়, ওরে নীল দরিয়া |
| রাষ্ট্রীয় পুরস্কার | একুশে পদক (১৯৮০), স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৯৬) |
| মৃত্যু | ৩০ আগস্ট ২০১৭ |
৩০ আগস্ট ২০১৭—বাংলা সঙ্গীত আকাশের এই উজ্জ্বল নক্ষত্র নিভে গেলেও তাঁর কণ্ঠ, তাঁর গান ও তাঁর দেশপ্রেম আজও বেঁচে আছে কোটি হৃদয়ে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।
