নাসা বিজ্ঞানীদের ধারাবাহিক মৃত্যু রহস্য বিশ্বজুড়ে

যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা এবং পারমাণবিক ও উচ্চপ্রযুক্তি গবেষণার সঙ্গে যুক্ত একাধিক বিজ্ঞানীর ধারাবাহিক মৃত্যু, নিখোঁজ হওয়া এবং রহস্যজনক ঘটনাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ ও কৌতূহল ক্রমেই বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে নাসার জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী মাইকেল হিকসের মৃত্যুর পর এই তালিকায় নবম ঘটনা যুক্ত হওয়ায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।

মাইকেল হিকস (৫৯) দীর্ঘদিন ক্যালিফোর্নিয়ার জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরি (জেপিএল)-তে কর্মরত ছিলেন। ১৯৯৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তিনি নাসার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মহাকাশ প্রকল্পে যুক্ত ছিলেন, যার মধ্যে ডার্ট মিশন, নিয়ার আর্থ অ্যাস্টেরয়েড ট্র্যাকিং সিস্টেম, ডন মিশন এবং ডিপ স্পেস–১ অন্যতম। ২০২৩ সালের জুলাই মাসে তাঁর মৃত্যু ঘটে, তবে মৃত্যুর কারণ বা আনুষ্ঠানিক ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না করায় বিষয়টি ঘিরে প্রশ্ন রয়ে গেছে। তাঁর শোকবার্তায় ‘অ্যালকোহলিকস অ্যানোনিমাস’-এ অনুদানের আহ্বান জানানো নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

এর আগে তাঁর সহকর্মী ফ্র্যাঙ্ক মাইওয়াল্ড ২০২৪ সালের জুলাই মাসে রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। একই সময়পর্বে নাসা এবং পারমাণবিক গবেষণার সঙ্গে যুক্ত আরও কয়েকজন বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদ নিখোঁজ বা হত্যাকাণ্ডের শিকার হন বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে, বিশেষ করে নিউইয়র্ক পোস্ট-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই ধারাবাহিক ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত একটি হলো মোনিকা রেজার নিখোঁজ হওয়া। তিনি নাসা জেপিএলের ম্যাটেরিয়াল প্রসেসিং গ্রুপের সাবেক পরিচালক ছিলেন। ২০২৫ সালের জুনে হাইকিংয়ে গিয়ে তিনি নিখোঁজ হন এবং এখন পর্যন্ত তাঁর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন বিমানবাহিনীর জেনারেল উইলিয়াম নীল ম্যাককাসল্যান্ড ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিজের বাসা থেকে ফোন ও চশমা ছাড়া বেরিয়ে যান এবং এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ রয়েছেন।

একই মাসে জেপিএলের জ্যোতিঃপদার্থবিদ কার্ল গ্রিলমেয়ার নিজ বাড়ির বারান্দায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এছাড়া লস আলামস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির দুই কর্মী অ্যান্থনি শ্যাভেজ ও মেলিসা ক্যাসিয়াস ২০২৫ সালে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন। জানা যায়, তারা বাসা ত্যাগের সময় মোবাইল ফোন ও ওয়ালেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ জিনিস রেখে গিয়েছিলেন, যা ঘটনাটিকে আরও রহস্যময় করে তোলে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বস্টনের ফিউশন শক্তি গবেষক নুনো লুরেইরো নিজ বাড়িতে নিহত হন। অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁর এক প্রাক্তন সহপাঠী ক্লডিও নেভেস ভ্যালেন্টে এই হত্যাকাণ্ড ঘটান। একই সময়ে নোভার্টিস ফার্মাসিউটিক্যালের ক্যানসার গবেষক জেসন থমাস কয়েক মাস নিখোঁজ থাকার পর ম্যাসাচুসেটসের একটি হ্রদ থেকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার হন।

ঘটনাগুলোর সংক্ষিপ্ত বিবরণ

নামপরিচয়ঘটনাসময়
মাইকেল হিকসনাসা জেপিএল বিজ্ঞানীমৃত্যু (কারণ অজানা)২০২৩ জুলাই
ফ্র্যাঙ্ক মাইওয়াল্ডনাসা গবেষকরহস্যজনক মৃত্যু২০২৪ জুলাই
মোনিকা রেজাজেপিএল পরিচালকনিখোঁজ২০২৫ জুন
উইলিয়াম ম্যাককাসল্যান্ডঅবসরপ্রাপ্ত জেনারেলনিখোঁজ২০২৫ ফেব্রুয়ারি
কার্ল গ্রিলমেয়ারজেপিএল বিজ্ঞানীহত্যা২০২৫ ফেব্রুয়ারি
অ্যান্থনি শ্যাভেজলস আলামস কর্মীনিখোঁজ২০২৫
মেলিসা ক্যাসিয়াসলস আলামস কর্মীনিখোঁজ২০২৫
নুনো লুরেইরোফিউশন গবেষকহত্যা২০২৫ ডিসেম্বর
জেসন থমাসক্যানসার গবেষকমৃত উদ্ধার২০২৫

এই ধারাবাহিক ঘটনাগুলো নিয়ে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে নানা ধরনের প্রশ্ন ও আলোচনা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক এফবিআই সহকারী পরিচালক ক্রিস সুয়েকার এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এসব ঘটনাকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। তাঁর মতে, এই বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত সংবেদনশীল ও উচ্চপ্রযুক্তি গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা মার্কিন প্রযুক্তি গবেষণার ওপর নজরদারি চালিয়ে আসছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, চীন, রাশিয়া, ইরান, উত্তর কোরিয়া এমনকি কিছু মিত্র দেশও উন্নত প্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে আগ্রহী হতে পারে।

তবে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত সংস্থা এই ঘটনাগুলোর মধ্যে সরাসরি কোনো যোগসূত্র বা সংগঠিত ষড়যন্ত্রের প্রমাণ নিশ্চিত করেনি। তবুও ধারাবাহিক মৃত্যু, হত্যা ও নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা বিজ্ঞান ও নিরাপত্তা মহলে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন না হয়ে কোনো বৃহত্তর নেটওয়ার্ক বা কাঠামোর অংশ হয়ে থাকে, তাহলে তা শুধু নাসা নয়, বরং সমগ্র বৈশ্বিক মহাকাশ গবেষণা ও প্রযুক্তি নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।