নারী জাগরণের আলোকবর্তিকা রোকেয়া: জন্ম-মৃত্যুদিনে দেশজুড়ে শ্রদ্ধা ও কর্মসূচি

আজ ৯ ডিসেম্বর রোকেয়া দিবস—নারী জাতির জন্য এক ঐতিহাসিক তাৎপর্যের দিন। নারী অধিকার আন্দোলনের পথিকৃৎ, সাহিত্যিক ও সমাজসংস্কারক বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের জন্মদিন ও মৃত্যুদিন একই তারিখে হওয়ায় দিনটি বাঙালি সমাজে বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে। আজ তাঁর ১৪৫তম জন্মবার্ষিকী ও ৯৩তম মৃত্যুবার্ষিকী।

১৮৮০ সালে রংপুরের পায়রাবন্দে জন্ম নেওয়া রোকেয়া এমন এক সমাজে বড় হয়েছেন, যেখানে নারীর পড়াশোনা, বাইরে যাওয়া এমনকি কথা বলাও ছিল বহু ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত। কিন্তু তিনি সেসব গণ্ডি ভেঙে বেরিয়ে এসেছিলেন নিজস্ব শক্তি, দৃষ্টিভঙ্গি ও দৃঢ়তায়। তাঁর সাহিত্যসৃষ্টি ও আন্দোলন নারীর আত্মমর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।

রোকেয়া বিশ্বাস করতেন, নারীর অগ্রগতি ছাড়া সমাজের অগ্রগতি অসম্ভব। তাঁর বিখ্যাত উক্তি—“নারী-পুরুষের সমতা ছাড়া সভ্যতা সম্পূর্ণতা পায় না”—আজও নারী অধিকার আন্দোলনের অন্যতম মৌলিক দর্শন। তাঁর রচিত ‘সুলতানার স্বপ্ন’ বিশ্বসাহিত্যে নারী-স্বাধীনতা ও নারীর শক্তি নিয়ে বিজ্ঞানচিন্তার প্রাচীনতম রূপগুলোর একটি। এছাড়া ‘অবরোধবাসিনী’ গ্রন্থে তিনি হিজাব, অবরোধ, নারীর ঘরবন্দী জীবনসহ সমকালীন সমাজের অসংখ্য বৈষম্যকে সাহসিকতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন।

তিনি শুধু লেখালেখি নয়—নারীর শিক্ষার ক্ষেত্রে বাস্তব উদ্যোগও নিয়েছিলেন। ১৯১৬ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল আজও দক্ষিণ এশিয়ায় নারীশিক্ষার ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।

রোকেয়া দিবস উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন স্থানে আলোচনা অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক আয়োজন ও সম্মাননা প্রদান করা হচ্ছে। রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় আজ আয়োজন করেছে বিশেষ অনুষ্ঠান। এখানে প্রদান করা হবে ২০২৫ সালের রোকেয়া পদক। এ বছর চারজন নারী এই মর্যাদাপূর্ণ পদকে ভূষিত হচ্ছেন—নারীশিক্ষায় গবেষণার জন্য রুভানা রাকিব, নারী শ্রম অধিকার রক্ষায় অবদানের জন্য কল্পনা আক্তার, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজের জন্য নাবিলা ইদ্রিস এবং নারী জাগরণে ক্রীড়াক্ষেত্রে ভূমিকার জন্য ঋতুপর্ণা চাকমা।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। সভাপতিত্ব করবেন উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ। প্রধান উপদেষ্টা তাঁর বাণীতে উল্লেখ করেছেন, বেগম রোকেয়ার সংগ্রাম নারীসমাজকে অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে যাওয়ার জন্য ছিল এক ঐতিহাসিক মাইলফলক।

আজকের সমাজে নারী উদ্যোক্তা, নারী খেলোয়াড়, নারী বিজ্ঞানী, নারী পুলিশ—সবক্ষেত্রেই নারীর অংশগ্রহণে যে বিস্ফোরণ ঘটেছে তা রোকেয়ার স্বপ্নেরই বহিঃপ্রকাশ। তিনি প্রত্যাশা করেছিলেন এমন এক সমাজ যেখানে নারী হবে সমান, স্বাধীন, আত্মনির্ভরশীল।

রোকেয়া দিবস সেই স্বপ্ন পূরণের চলমান সংগ্রামের প্রতীক। এই দিনটি স্মরণ করিয়ে দেয়—নারীর অগ্রগতি থেমে থাকা মানে সমাজের অগ্রগতি থেমে যাওয়া।