নারী ক্ষমতায়ন: অগ্রগতি থেকে বিপরীত পথে

আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। একসময়ে নারীর ক্ষমতায়নে রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত বাংলাদেশ বর্তমানে উল্টো পথে হেঁটেছে। সাম্প্রতিক তথ্য ও গবেষণা অনুসারে দেশের শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ কমছে, উচ্চশিক্ষায় নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা পিছিয়ে পড়ছে, রাজনৈতিক নেতৃত্বে নারীর উপস্থিতি সীমিত এবং নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতন উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়েক বছর ধরে নারীর ক্ষমতায়নের পথে প্রতিবন্ধকতা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য—‘অধিকার, ন্যায়বিচার, উদ্যোগ সব নারীর জন্য হোক’। প্রধানমন্ত্রী নারীদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, “আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই যেখানে নারী-পুরুষ সমান অধিকার ভোগ করবে।”

শ্রমবাজারে নারী: হ্রাসমান অংশগ্রহণ

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ-২০২৪ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশের মোট শ্রমশক্তি ৭.১৭ কোটি, যেখানে ২০২৩ সালে ছিল ৭.৩৪ কোটি। এক বছরে মোট শ্রমশক্তি ১৭ লাখ কমেছে, যার বড় অংশ নারী শ্রমিক। পারিবারিক দায়ভার, মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরার সমস্যা, নিরাপদ পরিবহণের অভাব এবং নারীবান্ধব কর্মপরিবেশের ঘাটতি প্রধান কারণ।

ক্ষেত্র২০২৩২০২৪পরিবর্তন
মোট শ্রমশক্তি৭.৩৪ কোটি৭.১৭ কোটি-১৭ লাখ
নারী শ্রমিকউল্লেখযোগ্যউল্লেখযোগ্য হ্রাসহ্রাস
তৈরি পোশাক খাত৮০% নারীকমছেধীরে ধীরে কমছে

এক সময়ে তৈরি পোশাক খাতে নারীর সংখ্যা ৮০% ছিল, বর্তমানে তা কমছে। দারিদ্র্য, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার খরচ বাড়ায় এই খাতের চাকরিকে নারীরা আর আকর্ষণীয় মনে করছেন না।

শিক্ষায় নারী: অগ্রগতির সীমাবদ্ধতা

প্রাথমিক শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ ৫১.২১%, মাধ্যমিকে বেড়ে ৫৪.৮৪% হলেও উচ্চমাধ্যমিকে কমে ৫০.৭৫% এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীর সংখ্যা ৪৭%। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীর অনুপাত যথাক্রমে ৫২ ও ৪৮ শতাংশ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও কম। কারিগরি ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষায় নারীর উপস্থিতিও সীমিত।

উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ কমার পেছনে দারিদ্র্য, বাল্যবিয়ে, যৌন হয়রানি, নিরাপদ পরিবহন না থাকা এবং আবাসিক সুযোগের অভাব মূল বাধা।

রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সহিংসতা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীর হার মাত্র ৪%, ৮৫ জন নারী প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে নির্বাচিত হয়েছেন মাত্র ৭ জন। সংস্থাগুলি জানাচ্ছে, নির্বাচনি কাঠামোগত বাধা, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা ও সাইবার বুলিং নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সীমিত করছে।

২০২৫ সালে ধর্ষণ ও পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা ২০২৪ সালের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫১% মেয়ের বিয়ে ১৮ বছর হওয়ার আগেই হচ্ছে। অনেকেই খুব কম বয়সে মা হচ্ছেন, যা তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারীর ক্ষমতায়ন শুধুমাত্র চাকরি বা বেতন বৃদ্ধি নয়। এটি নারীর মর্যাদা, অধিকার, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও সামাজিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ব্যাপক প্রক্রিয়া।

আজকের দিনটি স্মরণ করিয়ে দেয়, নারীর জন্য সমান সুযোগ ও অধিকার নিশ্চিত করা শুধু নারী নয়, সমগ্র জাতির উন্নয়নের চাবিকাঠি। নারী ক্ষমতায়ন সামাজিক, শিক্ষাগত, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মূল পরিবর্তন আনার মাধ্যমে পূর্ণতায় পৌঁছানো সম্ভব।