নারীপ্রধান পরিবারে ফ্যামিলি কার্ড: নতুন দিগন্তের সূচনা

দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং নারীর ক্ষমতায়নকে ত্বরান্বিত করতে সরকার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি। এই প্রকল্পের আওতায় প্রাথমিকভাবে দেশের ৩৭,৫৬৭টি নারীপ্রধান পরিবারকে মাসিক নির্দিষ্ট হারে আর্থিক ভাতা প্রদান করা হবে। আধুনিক ও ডিজিটাল পদ্ধতিতে সরাসরি উপকারভোগীর হাতে এই সহায়তা পৌঁছে দেওয়াই সরকারের মূল লক্ষ্য।

কর্মসূচির উদ্বোধন ও প্রেক্ষাপট

মঙ্গলবার সকাল ১০টায় রাজধানীর বনানীস্থ কড়াইল বস্তিসংলগ্ন টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই মানবিক কর্মসূচির শুভ উদ্বোধন করবেন। সোমবার বিকেলে অর্থ মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্তাব্যক্তিরা এই প্রকল্পের বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরেন। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই এই বিশাল সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে।

ভাতার পরিমাণ ও বিতরণ পদ্ধতি

নির্বাচিত প্রতিটি পরিবার মাসিক ২,৫০০ টাকা হারে এই ভাতা পাবেন। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ডিজিটাল বাংলাদেশ ও ক্যাশলেস সোসাইটি গঠনের লক্ষ্যে এই টাকা কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরাসরি উপকারভোগীর ব্যাংক হিসাব অথবা পছন্দসই মোবাইল ওয়ালেটে (যেমন: বিকাশ, নগদ বা রকেট) পৌঁছে যাবে। ফলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ভোগান্তি লাঘব হবে।

এক নজরে ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের প্রাথমিক চিত্র:

বিষয়ের বিবরণতথ্যের সারসংক্ষেপ
ভাতার পরিমাণমাসিক ২,৫০০ টাকা
প্রাথমিক উপকারভোগী৩৭,৫৬৭টি নারীপ্রধান পরিবার
উদ্বোধনের স্থানটিঅ্যান্ডটি মাঠ, কড়াইল, বনানী
বিতরণ পদ্ধতিব্যাংক হিসাব বা মোবাইল ওয়ালেট
মোট বরাদ্দ (জুন পর্যন্ত)৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা
যাচাইকৃত পরিবার সংখ্যা৪৭,৭৭৭টি

স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বাছাই প্রক্রিয়া

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্পষ্ট করেছেন যে, এই প্রকল্পের সুবিধাভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের রাজনৈতিক পরিচয় বা দলীয়করণকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়নি। সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক ও সফটওয়্যারের মাধ্যমে দারিদ্র্য সূচক নির্ধারণ করে এই তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। ১৩টি জেলার নির্দিষ্ট কিছু এলাকা থেকে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করে পরিবারের সদস্যসংখ্যা, বাসস্থান, ব্যবহৃত সামগ্রী এবং আয়ের উৎস যাচাই করা হয়েছে।

সমাজকল্যাণমন্ত্রী জানান, প্রাথমিকভাবে ৬৭,৮৫৪টি পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হলেও কঠোর যাচাই-বাছাই শেষে যারা প্রকৃতপক্ষেই হতদরিদ্র এবং অন্য কোনো সরকারি সুবিধা পাচ্ছেন না, তাদেরই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিশেষ করে সরকারি চাকরিজীবী, পেনশনভোগী বা বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মালিকদের এই আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও অন্তর্ভুক্তি

সরকার জানিয়েছে, বর্তমান পর্যায়টি একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প। আগামী জুন মাসের পর এই কর্মসূচির পরিধি আরও ব্যাপক আকারে বৃদ্ধি করা হবে। বর্তমানে শুধুমাত্র নারীপ্রধান পরিবারগুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হলেও, ভবিষ্যতে দরিদ্র পুরুষপ্রধান পরিবারগুলোকেও এই সামাজিক নিরাপত্তা জালের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগটি দেশের দারিদ্র্য বিমোচন এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণে একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।