নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলায় এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হয়েছে। টাকা ধার না পেয়ে নিজের আপন ভাবি ও মাত্র আট বছর বয়সী নিষ্পাপ ভাতিজাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যার দায়ে সাদিকুর রহমান সাদেক (২৭) নামে এক যুবককে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। আজ বৃহস্পতিবার (৬ নভেম্বর) দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক আবু শামীম আজাদ জনাকীর্ণ আদালতে এই আদেশ প্রদান করেন।
Table of Contents
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও নৃশংসতা
মামলার নথিপত্র এবং আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের ২ জুলাই দিবাগত রাতে আড়াইহাজার উপজেলার খাগকান্দা ইউনিয়নের উজানগোকান্দি এলাকায় এই পৈশাচিক ঘটনাটি ঘটে। দণ্ডপ্রাপ্ত সাদিকুর রহমান সাদেক ছিলেন ওই এলাকার মোবারক হোসেনের ছেলে। তিনি মূলত নেশাগ্রস্ত ছিলেন এবং প্রায়ই টাকার জন্য পরিবারের সদস্যদের বিরক্ত করতেন।
ঘটনার রাতে সাদিকুর তার ভাবি রাজিয়া সুলতানা কাকলির কাছে কিছু টাকা ধার চাইতে যান। কাকলির স্বামী অর্থাৎ সাদেকের বড় ভাই সে সময় বিদেশে কর্মরত ছিলেন। কাকলি টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সাদিকুর প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে ঘরে থাকা ধারালো বঁটি দিয়ে তিনি কাকলিকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে রক্তাক্ত করেন। এতে ঘটনাস্থলেই কাকলির মৃত্যু হয়। নৃশংসতা এখানেই থেমে থাকেনি; রাজিয়ার আট বছর বয়সী শিশুপুত্র তালহা তখন পাশে ঘুমিয়ে ছিল। হত্যাকাণ্ড দেখে ফেলার ভয়ে কিংবা স্রেফ আক্রোশে পাষণ্ড সাদিকুর ঘুমন্ত ভাতিজা তালহাকেও কুপিয়ে হত্যা করেন। হত্যার পর আলমারিতে রাখা স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা লুট করে তিনি পালিয়ে যান।
তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া
নিহত রাজিয়া সুলতানা কাকলির মা তাসলিমা বেগম পরের দিন আড়াইহাজার থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ তদন্তে নেমে পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলে দেবর সাদিকুরের আচরণের অসংলগ্নতা ধরা পড়ে। পরবর্তীতে তাকে গ্রেপ্তার করা হলে তিনি পুলিশের কাছে এবং পরে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন।
পুলিশ তদন্ত শেষে সাদিকুরকে একমাত্র আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে। দীর্ঘ শুনানিতে সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ এবং উভয় পক্ষের যুক্তি-তর্ক শেষে আদালত আজ এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন।
মামলার একনজরে সংক্ষিপ্ত বিবরণ
নিচে এই চাঞ্চল্যকর মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো একটি সারণির মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| তথ্যের বিষয় | বিবরণ |
| মামলার নাম | রাজিয়া সুলতানা কাকলি ও তালহা হত্যা মামলা |
| প্রধান আসামি | সাদিকুর রহমান সাদেক (২৭) |
| ভিকটিম | রাজিয়া সুলতানা কাকলি (ভাবি) ও তালহা (৮ বছর, ভাতিজা) |
| ঘটনার তারিখ | ২ জুলাই, ২০২২ |
| রায়ের তারিখ | ৬ নভেম্বর, ২০২৫ |
| বিচারক | আবু শামীম আজাদ (জেলা ও দায়রা জজ, নারায়ণগঞ্জ) |
| প্রদত্ত দণ্ড | মৃত্যুদণ্ড (ফাঁসি) ও অর্থদণ্ড |
| হত্যাকাণ্ডের কারণ | টাকা ধার না দেওয়া এবং স্বর্ণালংকার লুট |
রায় পরবর্তী প্রতিক্রিয়া
নারায়ণগঞ্জ আদালত পুলিশের পরিদর্শক মো. কাইউম খান জানান, রায় ঘোষণার সময় আসামি সাদিকুর রহমান কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। রায় শোনার পর তার মধ্যে কোনো অনুশোচনা দেখা না গেলেও আদালতের বারান্দায় নিহতের স্বজনরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
নিহত কাকলির মা ও মামলার বাদী তাসলিমা বেগম রায়ের পর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “আমার মেয়ে ও অবুঝ নাতিকে যে অন্যায়ভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছে, আজ তার সুবিচার পেলাম। আমরা দ্রুত এই রায় কার্যকর দেখতে চাই।” অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) আবুল কালাম আজাদ এই রায়কে ন্যায়বিচারের প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “এটি একটি বিরল ও নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড ছিল। অপরাধীর ফাঁসির আদেশের মাধ্যমে সমাজে একটি কঠোর বার্তা পৌঁছাবে যে, অপরাধ করে কেউ পার পাবে না।”
সামাজিক প্রভাব ও বর্তমান অবস্থা
আড়াইহাজারে এই জোড়া খুনের ঘটনা সে সময় দেশব্যাপী ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছিল। বিশেষ করে পারিবারিক কলহ এবং মাদকের প্রভাবে তরুণ সমাজের নৈতিক অবক্ষয় কতটা ভয়াবহ হতে পারে, এই ঘটনা তারই একটি জ্বলন্ত প্রমাণ। বর্তমানে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে কঠোর নিরাপত্তায় কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আইন অনুযায়ী, তিনি উচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ পাবেন। তবে এই দৃষ্টান্তমূলক রায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
