নাফ নদে আবারও জেলে অপহরণ

কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত আবারও উত্তেজনা ও আতঙ্কে ভরপুর। নাফ নদে মাছ ধরার সময় মিয়ানমারের সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠন আরাকান আর্মি ছয় জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। বুধবার ঝিমংখালি নাফ নদসংলগ্ন এলাকায় দুটি মাছ ধরার নৌকা থামিয়ে অস্ত্রধারীরা তাদের অপহরণ করে নিয়ে যায়। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে শুক্রবার, যখন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন।

হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ইউপি সদস্য সিরাজুল মোস্তফা লালু জানান, নিয়মিত মাছ ধরার কাজ চলছিল। তখনই হঠাৎ অস্ত্রধারীরা নৌকায় উঠে জেলেদের নামিয়ে নিয়ে যায়। এদের মধ্যে দুজন স্থানীয় বাংলাদেশি এবং চারজন রোহিঙ্গা। জেলেরা জানিয়েছেন, ঘটনা এত দ্রুত ঘটে যে প্রতিরোধ বা পালানোর কোনো সুযোগই ছিল না।

দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনার নতুন মাত্রা

মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং আরাকান আর্মির সম্প্রসারিত ক্ষমতার কারণে বাংলাদেশের দক্ষিণ সীমান্তে প্রায়ই উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ ধরনের অপহরণ কিংবা ধরপাকড়ের ঘটনা বেড়েই চলেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মিয়ানমারের যে অঞ্চলগুলোতে সরকারি বাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘর্ষ চলছে, সেগুলোর সাথে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের কিছু অংশ সরাসরি সংযুক্ত। ফলে বিদ্রোহী দলটি তাদের নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক প্রবাহ ধরে রাখতে কখনও কখনও বাংলাদেশি জেলেদেরও টার্গেট করছে।

আরাকান গ্লোবাল নেটওয়ার্কের দাবি

এই ঘটনার পাশাপাশি মিয়ানমারের আরাকান গ্লোবাল নেটওয়ার্ক নিউজ দাবি করেছে, আঞ্চলিক জলসীমা লঙ্ঘন ও অনুমতি ছাড়া মাছ ধরার অভিযোগে পৃথক অভিযানে আরও ছয়জন বাংলাদেশিকে আটক করেছে আরাকান কোস্টাল সিকিউরিটি ফোর্স। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী,

  • আটক জেলেদের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক আইন

  • এবং নিরাপত্তা আইনে
    কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এই দাবি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করা হয়নি। তবে এই ধরনের খবর সীমান্তে থাকা জেলেদের মধ্যে আরও ভয় তৈরি করেছে।

জেলেদের উদ্বেগ বাড়ছে

টেকনাফ উপকূলের জেলেরা জানান, প্রতিদিনই জীবিকার তাগিদে নাফ নদী কিংবা বঙ্গোপসাগরের মোহনায় যেতে হয়। কিন্তু আরাকান আর্মি বা অন্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি তাদের জীবনকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
এক জেলে বলেন, “আমরা জানি না কখন কারা এসে ধরে নিয়ে যাবে। সীমান্তে কোনো নিরাপত্তা নেই।”

প্রশাসনের অবস্থান

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমামুল হাফিজ নাদিম জানিয়েছেন,
ভুক্তভোগী পরিবার থেকে এখনো কেউ অফিসিয়াল অভিযোগ করেনি। তবে প্রশাসন বিষয়টি খতিয়ে দেখছে এবং বিভিন্ন সংস্থার সাথে যোগাযোগ করে তথ্য সংগ্রহ করছে।

স্থানীয় প্রশাসন মনে করছে, আনুষ্ঠানিক অভিযোগ এলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারবে। নাফ নদীতে জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সামগ্রিক বিশ্লেষণ

এই ঘটনা শুধু মানবিক নিরাপত্তার প্রশ্নই নয়, বরং একটি দ্বিপাক্ষিক সীমান্তসংকটেরও ইঙ্গিত দেয়। বাংলাদেশ-Myanmar সম্পর্কের টানাপড়েনের মাঝেই এসব ঘটনা নতুন সংকটের জন্ম দিচ্ছে।
— আরাকান আর্মির শক্তি বৃদ্ধি
— মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত
— সীমান্তজুড়ে দুর্বল নজরদারি
এসবকে বিশেষজ্ঞরা সংকটের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

পরিস্থিতি উত্তরণে দ্বিপাক্ষিকভাবে সমন্বয়, সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার এবং জেলেদের বিকল্প নিরাপদ মাছ ধরার অঞ্চল নির্ধারণ প্রয়োজন হতে পারে।