নাটোর পৌরবাসীর জন্য জীবন রক্ষাকারী ও আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছিল প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকার একটি অত্যাধুনিক লাইফ সাপোর্ট (আইসিইউ) অ্যাম্বুলেন্স। তবে মুমূর্ষু রোগীদের জীবন বাঁচানোর সেই বাহনটি হঠাৎ করেই হয়ে গেল ‘ভোটের গাড়ি’। সোমবার দুপুরে শহরের রাস্তায় সাধারণ মানুষ বিস্ময় নিয়ে দেখেন, সাইরেন বাজিয়ে রোগী নেওয়ার বদলে অ্যাম্বুলেন্সটি নির্বাচনী পোস্টার ও সাউন্ড সিস্টেম নিয়ে প্রচার চালাচ্ছে। এই ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনা ও জনরোষ তৈরি হলে তড়িঘড়ি করে গাড়িটি গ্যারেজে ফিরিয়ে নেয় কর্তৃপক্ষ।
Table of Contents
উপহারের প্রেক্ষাপট ও বর্তমান পরিস্থিতি
২০২২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে নাটোর জেলায় তিনটি বিশেষায়িত আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স হস্তান্তর করে ভারত সরকার। এর মধ্যে একটি নাটোর পৌরসভা, একটি আধুনিক সদর হাসপাতাল এবং অন্যটি সিংড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রতিটি অ্যাম্বুলেন্স ভেন্টিলেটর, অক্সিজেন এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার মতো দামি সরঞ্জামে সজ্জিত। উদ্দেশ্য ছিল—সংকটাপন্ন রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত বড় শহরে স্থানান্তরের সুবিধা প্রদান করা। তবে উদ্বোধনের চার বছর না পেরোতেই এমন সংবেদনশীল একটি বাহনকে প্রচারণার কাজে ব্যবহার করার ঘটনা দেশজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচার ও বিতর্কের সূত্রপাত
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি সভায় আসন্ন গণভোটের পক্ষে প্রচারণা চালানোর মৌখিক নির্দেশনা দেওয়া হয়। সেই নির্দেশনা পালনে নাটোর পৌরসভা কর্তৃপক্ষ গ্যারেজে পড়ে থাকা আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সটিকে বেছে নেয়। গাড়িটির চারপাশ নির্বাচনী পোস্টার দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয় এবং ছাদে বসানো হয় মাইক ও সাউন্ড সিস্টেম। সোমবার দুপুরে শহরের বিভিন্ন রাস্তায় এটি প্রচারণা শুরু করলে সাধারণ মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি ভাইরাল হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পৌর কর্তৃপক্ষ অ্যাম্বুলেন্সটি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান ও বর্তমান অবস্থা:
| বিষয়ের বিবরণ | বিস্তারিত তথ্য ও বর্তমান অবস্থা |
| অ্যাম্বুলেন্সের আনুমানিক মূল্য | প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। |
| প্রদানকারী পক্ষ | ভারত সরকার (বন্ধুত্বের নিদর্শন)। |
| হস্তান্তরের সময়কাল | ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২২। |
| বরাদ্দকৃত প্রতিষ্ঠান | নাটোর পৌরসভা। |
| অপব্যবহারের ধরণ | গণভোটের পোস্টার ও সাউন্ড সিস্টেম লাগিয়ে প্রচারণা। |
| কর্তৃপক্ষের দাবি | গ্যারেজে পড়ে থাকা গাড়ি সচল রাখতে এই পদক্ষেপ। |
| বর্তমান অবস্থান | সমালোচনার মুখে গ্যারেজে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। |
কর্তৃপক্ষের যুক্তি ও স্থানীয় ক্ষোভ
পৌরসভার কর আদায়কারী জুলফিকুল হায়দার এ বিষয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করে জানান, জ্বালানি খরচ অনেক বেশি হওয়ায় সাধারণ রোগীরা এই উচ্চ প্রযুক্তির অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নিতে আগ্রহী হন না। ফলে দীর্ঘ দিন এটি গ্যারেজে পড়ে ছিল। গাড়িটি সচল রাখতে এবং ব্যাটারি ও ইঞ্জিন ভালো রাখার উদ্দেশ্যেই এটি চালানো হয়েছিল। তবে জনগণের ক্ষোভের কারণে সেটি আর রাস্তায় রাখা হয়নি।
অন্যদিকে, পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা আমিনুর রহমান জানান, অ্যাম্বুলেন্সকে প্রচারণার কাজে ব্যবহারের বিষয়ে পৌর প্রশাসকের কোনো আনুষ্ঠানিক বা লিখিত সিদ্ধান্ত ছিল না। এটি মাত্র দুই ঘণ্টা ব্যবহারের পর সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে কে বা কাদের নির্দেশে এমন স্পর্শকাতর একটি চিকিৎসা বাহনকে নির্বাচনী কাজে ব্যবহার করা হলো, সে বিষয়ে কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি।
জনস্বাস্থ্য ও নৈতিক সংকট
সচেতন নাগরিক সমাজ মনে করছে, আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সের মতো সংবেদনশীল বাহনে উচ্চ শব্দে মাইকিং করা এবং যত্রতত্র চালানো কেবল অনৈতিক নয়, বরং এটি গাড়ির ভেতরের সূক্ষ্ম চিকিৎসা যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। ভারত সরকার জনস্বাস্থ্যের কল্যাণে যে মূল্যবান উপহার দিয়েছিল, সেটির এমন অমর্যাদা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক বার্তা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উপসংহার
নাটোরে আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে এই দায়িত্বজ্ঞানহীন কাণ্ড সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়হীনতা ও দূরদর্শিতার অভাবকেই ফুটিয়ে তুলেছে। সংকটাপন্ন রোগীর ভরসা হিসেবে পরিচিত এই বাহনটি ভবিষ্যতে যেন কেবল সেবার কাজেই ব্যবহৃত হয়, এমনটাই দাবি নাটোরবাসীর।
