নাইজেরিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় কাদুনা রাজ্যে সশস্ত্র বন্দুকধারীদের হামলায় গির্জা থেকে অন্তত ১৬৩ জন খ্রিষ্টান পুণ্যার্থী অপহৃত হওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। গত রোববার সাপ্তাহিক প্রার্থনা চলাকালে কুরমিন ওয়ালি ও আশপাশের এলাকায় অবস্থিত একাধিক গির্জায় একযোগে এই হামলা চালানো হয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় নেতাদের বর্ণনায় উঠে এসেছে, হামলাকারীরা পরিকল্পিতভাবেই বিপুল সংখ্যায় এসে গির্জাগুলোর প্রবেশ ও প্রস্থানপথ বন্ধ করে দেয় এবং উপস্থিত নারী-পুরুষ ও শিশুদের জোরপূর্বক পাশের ঝোপঝাড় ও জঙ্গলের দিকে নিয়ে যায়।
নাইজেরিয়ার উত্তরাঞ্চলের খ্রিষ্টান অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রেভারেন্ড জোসেফ হায়াব জানান, প্রথমে মোট ১৭২ জনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তবে সেই মুহূর্তের বিশৃঙ্খলার মধ্যে ৯ জন পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। বর্তমানে ১৬৩ জন এখনো বন্দুকধারীদের জিম্মায় রয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর ভাষায়, “এটি নিছক ডাকাতি নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত গণঅপহরণ। আমাদের সম্প্রদায় চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।”
স্থানীয় গ্রামপ্রধান ইশাকু দানআজুমি আরও বিস্তৃত তথ্য দিয়ে জানান, কুরমিন ওয়ালি গ্রামের অন্তত তিনটি গির্জা থেকে মোট ১৬৬ জনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তিনি অভিযোগ করেন, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা অস্বীকার করে কিছু রাজনৈতিক মহল ঘটনাটিকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে। “আমাদের মানুষজন বন্দুকধারীদের ভয়ে মাঠে যেতে পারছে না, চাষাবাদ কমে গেছে, গ্রামজীবন কার্যত স্থবির,” বলেন তিনি।
তবে এই দাবির সঙ্গে কাদুনা রাজ্য পুলিশের বক্তব্যে স্পষ্ট বিরোধ দেখা গেছে। রাজ্য পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ রাবিউ স্থানীয় টেলিভিশনে বলেন, এখন পর্যন্ত অপহরণের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ তাঁদের হাতে নেই। রাজ্যের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কমিশনার সুলে শাউইবুও ঘটনাটিকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বলে উল্লেখ করেন। এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য সাধারণ মানুষের মধ্যে আরও বিভ্রান্তি ও ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নাইজেরিয়ায় অপহরণ এখন একটি সংঘবদ্ধ ও লাভজনক অপরাধে পরিণত হয়েছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো গ্রামাঞ্চলের দুর্বল নিরাপত্তাব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে নিয়মিতভাবে মুক্তিপণের বিনিময়ে মানুষ অপহরণ করছে। সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে অপহরণ ও মুক্তিপণের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ আদায় করেছে এসব গোষ্ঠী। স্থানীয়দের মতে, আগে অল্পসংখ্যক মানুষ অপহৃত হলে গ্রামবাসীরাই চাঁদা তুলে মুক্তিপণ দিয়ে তাদের ফিরিয়ে আনত। কিন্তু এবার সংখ্যাটি এত বেশি যে সাধারণ মানুষের পক্ষে তা আর সম্ভব নয়।
নাইজেরিয়ায় অপহরণ পরিস্থিতির একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র নিচের টেবিলে তুলে ধরা হলোঃ
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| ঘটনার স্থান | কাদুনা রাজ্য, কুরমিন ওয়ালি এলাকা |
| হামলার সময় | রোববার, সাপ্তাহিক প্রার্থনার সময় |
| অপহৃতের মোট সংখ্যা | ১৬৩ জন |
| প্রথমে ধরে নেওয়া হয় | ১৭২ জন |
| পালিয়ে আসতে সক্ষম | ৯ জন |
| মুক্তিপণ আদায় (২০২৪–২৫) | প্রায় ১৬ লাখ ৬০ হাজার ডলার |
এই ঘটনার পর মানবাধিকার সংগঠনগুলো দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণ সরকারের কাছে জোরালো নিরাপত্তা ব্যবস্থা, অপহৃতদের উদ্ধারে কার্যকর অভিযান এবং গ্রামাঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানাচ্ছে। কাদুনার এই ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, নাইজেরিয়ায় নিরাপত্তা সংকট কেবল পরিসংখ্যান নয়—এটি হাজারো পরিবারের নিত্যদিনের বাস্তবতা।
