বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টার সময় মিয়ানমারের সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন আরাকান আর্মির (এএ) তিন সদস্যকে আটক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় ৮ নম্বর ওয়ার্ডের আমতলী সীমান্ত এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়। মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চলমান সংঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যে এই অনুপ্রবেশের ঘটনাটি স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
Table of Contents
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও বিজিবির অভিযান
বিজিবি ও স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, মিয়ানমারে জান্তা বাহিনী এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীদের মধ্যে চলমান তীব্র সংঘর্ষের জেরে সীমান্ত পরিস্থিতি কয়েক মাস ধরেই অস্থিতিশীল। সোমবার সন্ধ্যায় আমতলী সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে সন্দেহভাজন তিন ব্যক্তিকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেখে সেখানে টহলরত কক্সবাজার ব্যাটালিয়নের (৩৪ বিজিবি) সদস্যরা তাদের চ্যালেঞ্জ করেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা বৈধ কোনো কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হন এবং পরে স্বীকার করেন যে তারা আরাকান আর্মির সক্রিয় সদস্য। বিজিবি সদস্যরা তাদের তল্লাশি করে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মিয়ানমারের মুদ্রা (কিয়াট) উদ্ধার করেছেন।
আটককৃতদের নিরাপত্তার স্বার্থে দ্রুত প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষ করে নাইক্ষ্যংছড়ি থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সীমান্তে বর্তমানে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে এবং যেকোনো ধরনের অনধিকার প্রবেশ রুখতে টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি দ্বিগুণ করা হয়েছে।
একনজরে আটক ও সীমান্ত পরিস্থিতির বিবরণ
নিচে আটককৃতদের এবং বর্তমান সীমান্ত পরিস্থিতির একটি সারসংক্ষেপ প্রদান করা হলো:
| বিষয় | বিবরণ |
| আটককৃতদের পরিচয় | আরাকান আর্মির (AA) ৩ জন সদস্য |
| আটকের স্থান | আমতলী সীমান্ত এলাকা, ৮ নং ওয়ার্ড, ঘুমধুম |
| আটকের সময় | ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (সোমবার সন্ধ্যা) |
| জব্দকৃত সরঞ্জাম | মিয়ানমারের মুদ্রা (কিয়াট) |
| হস্তান্তরকৃত কর্তৃপক্ষ | নাইক্ষ্যংছড়ি থানা পুলিশ |
| সীমান্তের বর্তমান অবস্থা | উচ্চ সতর্কবার্তা ও বিজিবির কঠোর নজরদারি |
প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া ও আইনি ব্যবস্থা
নাইক্ষ্যংছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল বাতেন মৃধা এই গ্রেপ্তারের সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, বিজিবি তাদের কাছে তিনজনকে হস্তান্তর করেছে। তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং সীমান্ত আইন লঙ্ঘনের দায়ে নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। এছাড়া তাদের বাংলাদেশে প্রবেশের পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য বা নাশকতার পরিকল্পনা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে উচ্চতর পর্যায়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে।
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাজহারুল ইসলাম চৌধুরী জানিয়েছেন, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সীমান্ত ঘেঁষা জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। বিশেষ করে মাদক পাচার এবং অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের অনুপ্রবেশ রোধে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
সীমান্ত উত্তজনা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনী এবং আরাকান আর্মির মধ্যে যুদ্ধের প্রভাব প্রায়শই বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলায় অনুভূত হয়। ইতিপূর্বেও ওপার থেকে গোলাগুলির শব্দ এবং মর্টার শেল এসে পড়ার ঘটনায় আতঙ্কিত হয়েছেন স্থানীয়রা। এবারের অনুপ্রবেশের ঘটনাটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা আরও গভীর হয়েছে। সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সশস্ত্র সংগঠনের সদস্যদের অনুপ্রবেশ দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবির পাশাপাশি অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীকে আরও সুসংগঠিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।
আমতলী ও ঘুমধুম এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সন্ধ্যার পর সীমান্তের জিরো লাইনে প্রায়ই চলাফেরা লক্ষ্য করা যায়। বিজিবির এই সফল অভিযান অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করবে এবং সীমান্ত এলাকার মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
