নলতা আহ্ছানিয়া মিশনে ছয় হাজার রোজাদারের বিশাল ইফতার

সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার নলতা শরীফে রমজান মাসজুড়ে বিরাজ করে এক অভূতপূর্ব ধর্মীয় আবহ। মাঠজুড়ে বিশাল শামিয়ানা, সুশৃঙ্খল কাতার আর হাজার হাজার রোজাদারের প্রতীক্ষা—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক স্বর্গীয় পরিবেশ। নলতা কেন্দ্রীয় আহ্ছানিয়া মিশনের এই ইফতার মাহফিল কেবল সাতক্ষীরা নয়, বরং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। এখানে প্রতিদিন প্রায় ছয় হাজার মানুষ বিভেদ ভুলে একই কাতারে বসে ইফতার সম্পন্ন করেন।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও মিশনের ঐতিহ্য

এই মহতি উদ্যোগের সূচনা আজ থেকে প্রায় ৯১ বছর আগে। ১৯৩৫ সালে প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক সাধক, শিক্ষা অনুরাগী ও সমাজ সংস্কারক হযরত খান বাহাদুর আহ্ছানউল্লাহ (র.) নলতা কেন্দ্রীয় আহ্ছানিয়া মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তিনি নিজ উদ্যোগে রোজাদারদের জন্য ইফতারের ব্যবস্থা করতেন। শুরুতে মিশনের ক্ষুদ্র পরিসরে এই আয়োজন শুরু হলেও সময়ের ব্যবধানে তা বিশাল কর্মযজ্ঞে রূপ নিয়েছে। ১৯৬৫ সালে তাঁর ইন্তেকালের পর মিশন কর্তৃপক্ষ পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে এই ঐতিহ্যবাহী ধারা অব্যাহত রেখেছে।

বিশাল কর্মযজ্ঞ ও প্রস্তুতির নেপথ্যে

প্রতিদিন ছয় হাজার মানুষের জন্য মানসম্মত ইফতারি প্রস্তুত করা কোনো সহজ কাজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন হয় দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও কয়েকশ নিবেদিতপ্রাণ মানুষের শ্রম। মিশনের প্রধান হিসাবরক্ষক মো. এবাদুল হক জানান, রমজান শুরু হওয়ার অন্তত ৪০ দিন আগে থেকেই আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি শুরু হয়। রোদ-বৃষ্টি থেকে রোজাদারদের সুরক্ষা দিতে বিশালাকার প্যান্ডেল বা ছাউনি নির্মাণ করা হয়, যার পেছনে এ বছর ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫ লক্ষাধিক টাকা।

ইফতার আয়োজনের বিশালতা বুঝতে নিচের তালিকায় ব্যবহৃত উপকরণের পরিমাণ ও ব্যয়ের হিসাব দেওয়া হলো:

উপকরণের নাম/খাতদৈনিক ব্যবহারের পরিমাণ/ব্যয়
দুধ (ফিরনির জন্য)৫০০ কেজি
ডিম৬,০০০টি
ছোলা২৫০ কেজি
ময়দা২০০ কেজি
সুজি ও চিনি১১০ কেজি ও ১৫০ কেজি
আলু (শিঙাড়ার জন্য)আড়াই মণ (১০০ কেজি)
দৈনিক মোট ব্যয়২,৬০,০০০ – ২,৭০,০০০ টাকা
স্বেচ্ছাসেবক সংখ্যা২৫০ – ৩০০ জন

ইফতারির মেনু ও পরিবেশনা

রোজাদারদের পাতে সাধারণত সাত পদের স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর খাবার পরিবেশন করা হয়। এর মধ্যে থাকে—ঘিয়ে ভাজা শিঙাড়া, পাকা কলা, মিষ্টি ফিরনি, সেদ্ধ ডিম, ভেজানো চিড়া, ভুনা ছোলা এবং উন্নত মানের খেজুর। বাবুর্চি মোক্তার আলী, যিনি ৪৫ বছর ধরে এই রসুইঘরের নেপথ্যে কাজ করছেন, জানান যে প্রতিদিন ভোর সাড়ে পাঁচটা থেকে ফিরনি তৈরির মাধ্যমে দিনের কাজ শুরু হয়।

বিকেল তিনটার পর থেকে মূল মাঠের সাজসজ্জা শুরু হয়। সারিবদ্ধভাবে মাদুর বিছিয়ে তার ওপর প্লেট ও গ্লাস সাজানো হয়। বিকেল সাড়ে চারটার মধ্যে স্বেচ্ছাসেবকরা প্লেটে প্লেটে খাবার পৌঁছে দেন। ইফতারের আগ মুহূর্তে পুরো মাঠ যখন নিস্তব্ধ হয়ে মোনাজাতে মগ্ন হয়, তখন এক অনন্য আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি হয়।

ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য মেলবন্ধন

নলতার এই ইফতার মাহফিলে কেবল স্থানীয়রাই নন, দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন। সাতক্ষীরা শহর, এমনকি ঢাকা থেকেও দর্শনার্থীরা আসেন এই বিশালাকার আয়োজন প্রত্যক্ষ করতে। এখানে ধনী-দরিদ্রের কোনো ভেদাভেদ নেই; একজন রিকশাচালক আর একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা একই কাতারে বসে একই খাবার গ্রহণ করেন।

মিশনের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম বলেন, এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা ও সেবার চেতনা জাগিয়ে তোলা। পীর কেবলার ভক্ত ও মিশনের সদস্যদের আন্তরিক অনুদানেই এই বিশাল ব্যয়ভার বহন করা হয়। করোনার আগে এই আয়োজনের পরিধি আরও ব্যাপক ছিল, তখন পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতেও ইফতারি পাঠানো হতো। বর্তমানে কেবল মাঠের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকলেও এর জৌলুস ও ভক্তি বিন্দুমাত্র কমেনি।

পরিশেষে বলা যায়, নলতা আহ্ছানিয়া মিশনের এই ইফতার আয়োজন কেবল ক্ষুধা নিবারণের মাধ্যম নয়, বরং এটি ত্যাগের মাসে হাজারো প্রাণের মিলনমেলা এবং মানবিক মূল্যবোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।