দেশজুড়ে নদী থেকে লাশ উদ্ধার ঘটনার সংখ্যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, অনেক লাশ হত্যা ঘটনার পর অন্যত্র ফেলে দেওয়া হয় এবং অপরাধীরা প্রমাণ নষ্ট করার জন্য নদীতে ফেলে দেয়। এই পরিস্থিতি তদন্তকে জটিল করে তোলে এবং অনেক সময় নিহতদের পরিচয় দীর্ঘদিন ধরে শনাক্ত করা সম্ভব হয় না।
নৌ পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে দেশের নদী থেকে মোট ২,০৬৪টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৬৩৯টি লাশের পরিচয় এখনও অজানা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানিতে লাশ ফেলে দিলে দেহ দ্রুত পচন শুরু হয়, আঙুলের ছাপ মুছে যায় এবং দেহের অন্যান্য অংশ নষ্ট হয়। ফলে পরিচয় শনাক্তকরণ এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ে।
নৌ পুলিশের তথ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নদী থেকে উদ্ধার হওয়া লাশের চিত্র নিম্নরূপ:
| বছর/সময়কাল | উদ্ধার হওয়া লাশের সংখ্যা | মন্তব্য |
|---|---|---|
| ২০২১–২০২৫ (মোট) | ২,০৬৪ | নৌ পুলিশের হিসাব |
| পরিচয় শনাক্ত | ১,৪২৫ | অধিকাংশ ক্ষেত্রে আঙুলের ছাপ ও তদন্তে শনাক্ত |
| পরিচয় অজানা | ৬৩৯ | তদন্ত এখনো অমীমাংসিত |
| ২০২৪ | প্রায় ৪৪০ | বিভিন্ন থানায় অন্তত ৪১টি হত্যা মামলা |
| ২০২৫ জানুয়ারি–জুলাই | অন্তত ৩০১ | নারী, পুরুষ ও শিশু |
তদন্ত সূত্রে জানা যায়, নদী থেকে উদ্ধার হওয়া লাশের সঙ্গে নিখোঁজ ব্যক্তিদের জিডি মিলিয়ে দেখা হয়। আঙুলের ছাপ নষ্ট হলে ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ করা হয়, যাতে ভবিষ্যতে শনাক্ত করা যায়।
একটি উদাহরণ পাওয়া যায় নারায়ণগঞ্জ থেকে। গত বছরের ২৮ আগস্ট শীতলক্ষ্যা নদী থেকে একটি মস্তকবিহীন লাশ উদ্ধার হয়। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের সহায়তায় আঙুলের ছাপ মিলিয়ে ২৭ বছর বয়সী হাবিব, সোনারগাঁ উপজেলার মধ্য কাঁচপুর এলাকার বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়। তবে তার মাথা এখনও উদ্ধার হয়নি। ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
অন্যদিকে, একই সময়ে বুড়িগঙ্গা নদী থেকে একটি অজ্ঞাত নারী ও শিশুর লাশ উদ্ধার হয়। ময়নাতদন্তে জানা যায়, শ্বাসরোধে হত্যার পর লাশ নদীতে ফেলা হয়েছিল। ছয় মাস পার হলেও তাদের পরিচয় এখনও অজানা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, নদীতে ফেলে দেওয়া লাশের কারণে তদন্ত বিভ্রান্তিকর হয়। মাছের কামড় বা জাহাজের ধাক্কা দেখে হত্যার প্রকৃতি নির্ধারণ করা কঠিন হয়। প্রাথমিকভাবে অনেক মামলা অস্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত হলেও, ময়নাতদন্তে হত্যার প্রমাণ মিললে তা হত্যা মামলায় রূপ নেয়।
অপরাধ বিশ্লেষকেরা বলছেন, সংঘবদ্ধ অপরাধীরা হত্যার আগেই পরিকল্পনা করে কোথায় লাশ ফেলা হবে। নদী বা রেলপথ বেছে নেয়া হয় কারণ এখানে প্রমাণ দ্রুত নষ্ট হয় এবং পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়। নৌ পুলিশ জানাচ্ছে, শনাক্ত না হওয়া লাশের ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ করা হয় এবং নতুন সূত্র পাওয়া গেলে মামলা আবারও সক্রিয় করা হয়।
দেশের নদীগুলোতে অজ্ঞাত শত শত লাশ এখনো অসংখ্য অমীমাংসিত হত্যাকাণ্ডের গল্প লুকিয়ে রাখছে, যা ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়।
