বাংলাদেশে দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিক্রমা শেষে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার গঠিত হয়েছে। আজ ১৭ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার বিএনপি নেতৃত্বাধীন এই নতুন সরকার শপথ গ্রহণ করতে যাচ্ছে। তবে আনন্দঘন এই মুহূর্তেও নবনির্বাচিত সরকারের সামনে পুষ্পশয্যা অপেক্ষা করছে না; বরং তাদের মোকাবিলা করতে হবে বিগত কয়েক বছরের পুঞ্জীভূত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট। বিশেষ করে, দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাই হবে এই সরকারের জন্য অ্যাসিড টেস্ট বা অগ্নিপরীক্ষা।
বিদ্যুৎ খাতের ঋণের বোঝা ও উৎপাদন সংকট
নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যুৎ খাতের বিশাল অঙ্কের বকেয়া পাওনা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকেই এই বকেয়ার পাহাড় জমতে শুরু করে, যা বর্তমানে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। দেশীয় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন ‘বিপ্পা’র মতে, তাদের পাওনার পরিমাণ প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে, ভারতের আদানি পাওয়ারের বকেয়া ১০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে হলে এই বিশাল অংকের অর্থের জোগান দেওয়া নতুন সরকারের জন্য এক হিমালয়সম চ্যালেঞ্জ।
বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক অসংগতির একটি তুলনামূলক চিত্র নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো:
| সূচক | ২০১১-২০১৪ সময়কাল | ২০২৫-২০২৬ (বর্তমান অবস্থা) | পরিবর্তনের হার/পরিমাণ |
| পিডিবির বার্ষিক লোকসান | ৫,৫০০ কোটি টাকা (২০১৫) | ৫০,০০০ কোটি টাকার বেশি | প্রায় ১০ গুণ বৃদ্ধি |
| বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা | ভিত্তি বছর | ৪ গুণ বৃদ্ধি | – |
| বেসরকারি কেন্দ্রকে পরিশোধ | ভিত্তি বছর | ১১ গুণ বৃদ্ধি | উদ্বেগজনক |
| ক্যাপাসিটি পেমেন্ট | ভিত্তি বছর | ২০ গুণ বৃদ্ধি | নজিরবিহীন |
জ্বালানি নিরাপত্তা ও গ্যাসের ক্রমবর্ধমান ঘাটতি
জ্বালানি খাতে বিশেষ করে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট নতুন সরকারকে দীর্ঘমেয়াদী সংকটে ফেলতে পারে। পেট্রোবাংলার প্রাক্কলন অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যার বিপরীতে সরবরাহ মাত্র ২৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি নিয়ে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো ধুঁকছে। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দুটি এলএনজি টার্মিনাল বাতিল করায় ভবিষ্যতে আমদানির সক্ষমতাও সীমিত হয়ে পড়েছে। এর ফলে হাতে টাকা থাকলেও গ্যাস সরবরাহের কারিগরি অবকাঠামো না থাকায় সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত গ্যাসের চাহিদা ও ঘাটতির একটি প্রাক্কলন নিচে দেওয়া হলো:
২০২৫-২৭: চাহিদা বেড়ে দাঁড়াবে ৩৮৫০-৩৮৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট; ঘাটতি হবে ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট।
২০২৮-২৯: চাহিদা ৩৯২৫ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও সরবরাহ না বাড়ায় সংকট প্রকট থাকবে।
২০৩০-৩১: নতুন টার্মিনাল ও দেশীয় খনি থেকে উৎপাদন সামান্য বাড়লে ঘাটতি ৫০০ মিলিয়নে নামার সম্ভাবনা রয়েছে।
উত্তরণের পথ ও বিশেষজ্ঞ অভিমত
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেইনের মতে, নতুন সরকারকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ভর্তুকি ব্যবস্থাপনায় হাত দিতে হবে। হুট করে ভর্তুকি তুলে নিলে দ্রব্যমূল্য আকাশচুম্বী হতে পারে, আবার ভর্তুকি বহাল রাখলে বাজেট ঘাটতি বাড়বে। তাই বছরভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে ধীরে ধীরে ভর্তুকি কমিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এছাড়া, আমদানিনির্ভরতা কমাতে স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই।
সার্বিকভাবে, নতুন রাজনৈতিক সরকারের প্রথম ১০০ দিনের কাজের বড় অংশই দখল করে থাকবে এই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংস্কার। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ এবং শিল্পের চাকা সচল রাখতে অর্থের সংস্থান ও কূটনৈতিক দক্ষতার সমন্বয় ঘটানোই এখন সময়ের দাবি।
