নতুন সরকারের সূচনালগ্নেই প্রশাসন, শিক্ষাঙ্গন ও স্থানীয় সরকার কাঠামোয় নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে জনমনে একধরনের উদ্বেগ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বারবার অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার যে অঙ্গীকার উচ্চারিত হয়েছে, বাস্তব প্রয়োগে তার প্রতিফলন কতটা ঘটছে—এ প্রশ্ন এখন ক্রমশ জোরালো হয়ে উঠছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, সহ-উপাচার্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় বিবেচনার প্রাধান্য নিয়ে নানা মহলে আলোচনা চলছে। সচেতন নাগরিকদের একাংশ মনে করছেন, বিগত কঠিন সময়ে যারা নিপীড়ন-নির্যাতনের মুখেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় সোচ্চার ছিলেন—লেখক, শিক্ষক, গবেষক, সাংবাদিক ও উন্নয়নকর্মীদের মতো বিভিন্ন পেশাজীবী—তাদের প্রতিনিধিত্ব বর্তমান কাঠামোয় দৃশ্যমান নয়। এতে করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা আংশিকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে অনেকে মত দিচ্ছেন।
অন্যদিকে রাজনৈতিক দলটির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যেও একধরনের অসন্তোষ লক্ষ করা যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে মামলা, গ্রেফতার ও প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে দলকে টিকিয়ে রাখা অনেক নেতাকর্মী মনে করছেন, গুরুত্বপূর্ণ পদে তাদের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি। এতে দলের অভ্যন্তরে বৈষম্যের ধারণা তৈরি হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
দেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতির দিকে তাকালেও একটি বড় বৈপরীত্য দেখা যায়। সরকারি চাকরির সংখ্যা মোট শ্রমশক্তির তুলনায় অত্যন্ত সীমিত, যেখানে বেসরকারি ও অনানুষ্ঠানিক খাতেই অধিকাংশ মানুষের কর্মসংস্থান নির্ভরশীল।
নিম্নে সাম্প্রতিক কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান উপস্থাপন করা হলো—
| খাত | আনুমানিক সংখ্যা | শতাংশ/অবস্থান |
|---|---|---|
| সরকারি চাকরি | প্রায় ১৫ লাখ | মোট শ্রমশক্তির অল্প অংশ |
| মোট কর্মজীবী মানুষ | প্রায় ৭৩.৬৯ মিলিয়ন | — |
| প্রাতিষ্ঠানিক বেসরকারি খাত | — | প্রায় ১৪.২% |
| অনানুষ্ঠানিক/ব্যক্তিখাত | — | প্রায় ৬০.৯% |
| তৈরি পোশাকশিল্প | ৫০ লাখের বেশি | প্রধান শিল্পখাত |
| নিবন্ধিত বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা | ২,৫৫৪টির বেশি | উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান |
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়ার ফলে দেশে বেকারত্বের চাপ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষিত তরুণ ও পেশাজীবীদের একটি বড় অংশ কর্মসংস্থানের অভাবে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বৃহৎ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করা গেলে তা একদিকে যেমন প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি করবে, অন্যদিকে সামাজিক স্থিতিশীলতাও জোরদার হবে। মেধা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
সর্বোপরি, রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত—যেখানে দলীয় সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে উঠে সামগ্রিক জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া জরুরি। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, যে নেতৃত্ব জনগণের মেধা ও অবদানকে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়, সংকটকালে তাদের প্রতি সমর্থনও ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে পড়ে। তাই টেকসই উন্নয়ন ও সুদৃঢ় রাষ্ট্রগঠনের লক্ষ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নিয়োগনীতি এখন অপরিহার্য।
সমাজ বিশ্লেষক, গবেষক ও উন্নয়ন কর্মী।
