নকলমুক্ত শিক্ষার স্থপতি মিলন

বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের আলোচিত ব্যক্তিত্ব ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন আবারও জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। চাঁদপুর-১ (কচুয়া) আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন এবং পরবর্তীতে শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। নির্বাচনী প্রচারে তার ব্যতিক্রমী গণসংযোগ, সরল ভাষা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ কচুয়ার নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণী ও প্রবীণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।

ড. মিলনের শিক্ষা ও রাজনৈতিক জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি কেবল একজন রাজনীতিবিদ নন; বরং শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারক হিসেবেই বেশি পরিচিত। রাজধানীর শেরেবাংলা নগর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং সরকারি বিজ্ঞান কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবনে তিনি ফজলুল হক হল ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) ছিলেন।

১৯৮২ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান এবং নিউইয়র্ক ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে এমবিএ ডিগ্রি লাভ করেন। সেখানে ব্রুকলিন কলেজ ও বরো অব ম্যানহাটন কমিউনিটি কলেজে অধ্যাপনা করেন। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে মালয়েশিয়ার আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিএইচডি অর্জন করেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল বাংলাদেশের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার আর্থ-সামাজিক প্রভাব—যা তার নীতিনির্ধারণী ভাবনায় সুস্পষ্ট প্রভাব ফেলেছে।

তার রাজনৈতিক পথচলা শুরু ছাত্রজীবনে। ১৯৯৬ সালে প্রথমবার কচুয়া থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে ২০০১ সালে পুনর্নির্বাচিত হয়ে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পরই তার কার্যকর ভূমিকা সর্বাধিক আলোচিত হয়। সে সময় পরীক্ষায় নকল ও প্রশ্নফাঁস ছিল বড় সামাজিক ব্যাধি। ড. মিলন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করে নিজে বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। ফলে পাবলিক পরীক্ষায় শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা ফিরে আসে।

শিক্ষা খাতে তার উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ (২০০১–২০০৬)

উদ্যোগউদ্দেশ্যফলাফল
নকলবিরোধী জিরো টলারেন্সপাবলিক পরীক্ষায় স্বচ্ছতানকল প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে কমে
কারিগরি শিক্ষায় জোরকর্মমুখী দক্ষতা বৃদ্ধিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে ভর্তি বৃদ্ধি
নতুন ভবন ও ল্যাব স্থাপনঅবকাঠামো উন্নয়নগ্রামীণ শিক্ষায় সুযোগ সম্প্রসারণ
নারী শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তিঝরে পড়া রোধমেয়েদের স্কুলে উপস্থিতি বৃদ্ধি

ড. মিলন বরাবরই জিপিএ-নির্ভর মূল্যায়নের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে বাস্তব দক্ষতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ রোধ করে শ্রেণিকক্ষভিত্তিক কার্যকর পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে। প্রশ্নপত্র ফাঁস ও কারিকুলাম বিতর্কের বর্তমান প্রেক্ষাপটে তার অভিজ্ঞতা ও দৃঢ়তা নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে।

কচুয়ার অবহেলিত জনপদকে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বৃদ্ধি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির মাধ্যমে একটি মডেল উপজেলায় রূপান্তরের কৃতিত্বও তার নেতৃত্বের সঙ্গে জড়িত। স্থানীয়দের মতে, তিনি মাটি ও মানুষের নেতা থেকে জাতীয় পর্যায়ের এক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিক্ষা খাত যখন নীতিগত সংস্কার, কারিকুলাম পুনর্মূল্যায়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকায়নের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, তখন ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলনের নেতৃত্বে আবারও একটি দৃশ্যমান পরিবর্তনের প্রত্যাশা জাগছে। অতীতের নকলবিরোধী কঠোর অবস্থানের মতোই তিনি নতুন মেয়াদেও শিক্ষাক্ষেত্রে শৃঙ্খলা, মানোন্নয়ন ও কর্মমুখী রূপান্তরের চমক দেখাবেন—এমনটাই বিশ্বাস সচেতন মহলের।