ভোরের কুয়াশা সরতেই বগুড়ার এক কৃষক তার সোনালি ধানের মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন। ফলন ভালো হয়েছে, জমিতে পরিশ্রম সার্থক হয়েছে—তবুও তার চোখে স্বস্তি নেই। কারণ তিনি জানেন, ধান ফলানোই শেষ নয়; প্রকৃত সংগ্রাম শুরু হয় বাজারে। তার সরল প্রশ্ন—“ধান তো ফলাই, কিন্তু লাভটা যায় কোথায়?” এই প্রশ্নই আজ বাংলাদেশের লাখো কৃষকের বাস্তবতা।
বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বে ধান উৎপাদনে শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর একটি। বছরে প্রায় ৩.৫ থেকে ৪ কোটি টন ধান উৎপাদিত হয়, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি। কিন্তু এই উৎপাদন সাফল্য কৃষকের আয়ে তেমন প্রতিফলিত হয় না। অর্থাৎ সমস্যা উৎপাদনে নয়; বরং বাজার কাঠামো, মূল্য নির্ধারণ এবং আর্থিক প্রবাহে গভীর অসাম্য রয়েছে।
উৎপাদিত ধানের পুরোটা বাজারে আসে না। পারিবারিক ভোগ, বীজ সংরক্ষণ এবং অপচয় বাদ দিলে মোট উৎপাদনের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বাজারে প্রবেশ করে। এই অংশই কৃষকের আয়ের প্রধান উৎস। কিন্তু বাজারে প্রবেশের পর কৃষকের নিয়ন্ত্রণ প্রায় শেষ হয়ে যায়। ধানের যাত্রাপথ দীর্ঘ—কৃষক থেকে ফড়িয়া, আড়তদার, মিলার, পাইকার হয়ে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত। প্রতিটি ধাপে মূল্য বাড়লেও কৃষক পান সবচেয়ে কম, আর ভোক্তা দেন সবচেয়ে বেশি।
এই ব্যবধানের অন্যতম কারণ তথ্যের অভাব ও দরকষাকষির দুর্বলতা। অধিকাংশ কৃষক সময়মতো বাজারদরের তথ্য পান না। ফলে তারা হয়ে পড়েন “মূল্যগ্রহীতা”—অর্থাৎ বাজার যা নির্ধারণ করে, তা মেনে নিতে বাধ্য হন।
ধান বাজারে আরেকটি বড় বাস্তবতা হলো মৌসুমি মূল্যপতন। ফসল কাটার সময় সরবরাহ বেড়ে যায়, ফলে দাম কমে যায়। কিছুদিন পর সরবরাহ কমলে দাম বাড়ে, কিন্তু তখন কৃষকের হাতে বিক্রির মতো ধান থাকে না। এই পরিস্থিতিতে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে ধান বিক্রি করেন, যাকে বলা হয় “ডিস্ট্রেস সেলিং”।
বর্তমান গড় চিত্র অনুযায়ী:
| সূচক | পরিমাণ |
|---|---|
| বাজারদর (প্রতি মণ) | ১,১০০–১,২৫০ টাকা |
| সরকারি মূল্য | ১,৩০০–১,৩৫০ টাকা |
| সম্ভাব্য ক্ষতি (প্রতি মণ) | ১০০–২০০ টাকা |
| ১০০ মণে ক্ষতি | ১০,০০০–১২,০০০ টাকা |
এই ক্ষতি কৃষকের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে।
সমস্যা আরও গভীরে রয়েছে আর্থিক কাঠামোতে। দেশে ব্যাংক আমানতের প্রায় ৮৪ শতাংশ শহরে কেন্দ্রীভূত, গ্রামে মাত্র ১৬ শতাংশ। ঋণ বিতরণেও একই চিত্র—৯২ শতাংশ শহরে, গ্রামে মাত্র ৭–৮ শতাংশ। ফলে কৃষক সহজে ঋণ পান না। জরুরি প্রয়োজনে—যেমন চিকিৎসা বা শিক্ষার খরচ—নগদ অর্থের অভাবে তারা কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হন। এতে তাদের দরকষাকষির ক্ষমতা আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার ‘ই-প্রকিউরমেন্ট’ বা ডিজিটাল ক্রয়ব্যবস্থা চালু করেছে। ‘কৃষকের অ্যাপ’-এর মাধ্যমে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০১৯ সালে। এর ফলে মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ব্যবস্থায় অংশগ্রহণকারী কৃষকের আয় ২৪ থেকে ৩২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে এবং পারিবারিক আয়ও ১০ থেকে ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে এই উদ্যোগের প্রভাব এখনও সীমিত। বাস্তব সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- মাত্র ৩০–৪০ শতাংশ কৃষক এই ব্যবস্থায় অংশ নিতে পারেন
- লটারিভিত্তিক নির্বাচন পদ্ধতি
- সংগ্রহ কেন্দ্রের দূরত্ব
- ডিজিটাল দক্ষতার অভাব
- সময়মতো সরকারি ক্রয় শুরু না হওয়া
ফলে একই এলাকায় একজন কৃষক লাভবান হলেও অন্যজন বঞ্চিত থাকেন।
সমগ্র চিত্র বিশ্লেষণ করলে সংকটকে তিনটি স্তরে ভাগ করা যায়—প্রথমত, আর্থিক বৈষম্য; দ্বিতীয়ত, বাজার কাঠামোর দুর্বলতা; এবং তৃতীয়ত, নীতির সীমিত বাস্তবায়ন।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। যেমন—ফসল কাটার শুরুতেই সরকারি ক্রয় কার্যক্রম চালু করা, গ্রামীণ এলাকায় আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ প্রদান, মোবাইলের মাধ্যমে বাজারদর তথ্য সরবরাহ, ই-প্রকিউরমেন্ট সর্বজনীন করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও তদারকি নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের গবেষণা অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে ধান উৎপাদনে কৃষকের প্রকৃত লাভ এতটাই কম যে নিজের শ্রমের মূল্য হিসাব করলে তা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি দাঁড়ায়।
ধান শুধু একটি কৃষিপণ্য নয়; এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং কোটি মানুষের জীবিকার সঙ্গে জড়িত। আমাদের খাদ্যাভ্যাস এখনো ভাতনির্ভর—অতএব কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা মানে দেশের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।
প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব হবে, যেদিন একজন কৃষক নিশ্চিন্তে বলতে পারবেন—“আমি আমার ধানের ন্যায্য দাম পেয়েছি।”
