ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জমজমাট ঈদ মেলা

রাজধানীর ধানমন্ডিতে দেশীয় পণ্য ও সৃজনশীল নকশার সমাহারে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী বিশেষ ঈদ মেলা। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রসারে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ‘মাইডাস’-এর আয়োজনে ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে এই মেলাটি মূলত দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ৫৬ জন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার পণ্য প্রদর্শনী ও বিক্রির একটি মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। এই আয়োজনের বিশেষত্ব হলো, অংশগ্রহণকারী উদ্যোক্তাদের সিংহভাগই নারী, যারা নিজেদের উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে দেশি পণ্যকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।

মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ও সময়সূচী

বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ ২০২৬) দুপুরে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই মেলার উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাইডাসের চেয়ারম্যান পারভীন মাহমুদ এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম খাইরুল বাশার। এছাড়াও অংশগ্রহণকারী উদ্যোক্তারা এই সময় উপস্থিত ছিলেন। মেলাটি আগামী শনিবার পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দর্শনার্থী ও ক্রেতা সাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

পণ্যের বৈচিত্র্য ও দামের ধারণা

মেলায় ঢুকেই চোখে পড়ে দেশি ঘরানার আধুনিক শাড়ি, থ্রি-পিস, পাঞ্জাবি ও ফতুয়ার বিশাল সমাহার। বিশেষ করে তাঁত, খাদি ও রাজশাহী সিল্কের ওপর হাতের কাজ করা পোশাকগুলো ক্রেতাদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করছে। এছাড়া পরিবেশবান্ধব পণ্য হিসেবে পাট ও চামড়াজাত সামগ্রী এবং হাতে তৈরি মাটির ও কাঠের গয়নার দোকানেও ভিড় দেখা গেছে।


একনজরে মেলার পণ্য ও মূল্যতালিকা

পণ্যের ধরণউপকরণের বৈচিত্র্যআনুমানিক মূল্য (টাকা)
শাড়িজামদানি, রাজশাহী সিল্ক, তাঁত ও বুটিক৭০০ – ২০,০০০
পোশাকপাঞ্জাবি, ফতুয়া, থ্রি-পিস ও ব্লেজার১,২০০ – ৮,০০০
গয়নাকাঠ, মাটি ও মেটালের কারুকাজ১০০ – ২,৫০০
পাটের পণ্যব্যাগ, ফ্লোরম্যাট ও শোপিস৩০০ – ১,৫০০
সুগন্ধিদেশি মিশ্রণের পারফিউম ও আতর১০০ – ১,৮০০

সফল উদ্যোক্তাদের গল্প ও আগামীর চ্যালেঞ্জ

মেলায় অংশ নেওয়া ‘স্বপ্নীল হাউস’-এর উদ্যোক্তা শারমিন সুলতানা জানান, তিনি ২০২১ সাল থেকে দেশি কাপড় নিয়ে কাজ করছেন। বর্তমানে তাঁর তৈরি পোশাক সৌদি আরব, চীন ও যুক্তরাজ্যে রপ্তানি হচ্ছে। তবে তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষ করে ইউরোপে পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে ‘হালাল সার্টিফিকেট’ বা নির্দিষ্ট মান নিয়ন্ত্রণ সনদ না থাকা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

অন্যদিকে, ‘লিজা বুটক্স’-এর এলিজা পারভীন ১৯৯৭ সাল থেকে এই ব্যবসায় রয়েছেন। ভারত থেকে নকশার ওপর বিশেষ কোর্স করা এই উদ্যোক্তা জানান, বর্তমানে কাঁচামালের দাম বাড়লেও ক্রেতারা সস্তায় পণ্য খুঁজতে চান, যা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য একটি বড় সংকট।

পরিবেশবান্ধব পণ্যের স্টল ‘আয়মান’স ক্রিয়েশন’ মাত্র ২০ হাজার টাকা নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও এখন তাদের সংগ্রহে ৩ লাখ টাকার বেশি পণ্য রয়েছে। হোগলা পাতা, বাঁশ ও পাটের তৈরি তাদের এই পণ্যগুলো টেকসই ও নান্দনিক।

গয়না ও দেশি সুগন্ধির নতুন ট্রেন্ড

মেলায় হাতে তৈরি গয়নার স্টলগুলোতে তরুণীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। ‘ট্রেন্ড অ্যান্ড ট্রেডিশন’-এর ইমিনা সৃষ্টি জানান, তাঁর বোন চারুকলা থেকে পাস করে মাটির ও কাঠের ওপর শৈল্পিক প্রলেপ দিয়ে এসব গয়না তৈরি করেন। গত এক মাসে একটি মেলাতেই তাঁরা লক্ষাধিক টাকার পণ্য বিক্রি করেছেন।

পাশাপাশি, দেশি উদ্যোগে তৈরি সুগন্ধির চাহিদাও বাড়ছে। ‘মোরাক্কাজ’ ও ‘আজান পারফিউম’ ব্র্যান্ড দুটি ফ্রান্স ও সৌদি আরবের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশেই উন্নতমানের সুগন্ধি প্রস্তুত করছে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও তরুণ প্রজন্মের কাছে ছোট বোতলের এসব পারফিউম ব্যাপক জনপ্রিয়।

ক্রেতা সমাগম ও সন্তুষ্টি

কলাবাগান থেকে আসা গৃহিণী সমাপ্তি জানান, “এক ছাদের নিচে এত দেশি পণ্যের সংগ্রহ সচরাচর দেখা যায় না। নকশাগুলো বেশ নতুন এবং মানসম্মত।” তবে কিছু ক্রেতা জামদানি শাড়ির সংগ্রহ আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। সব মিলিয়ে, দেশি কৃষ্টি ও সংস্কৃতির এই মেলবন্ধন ঈদ উদযাপনে ভিন্ন মাত্রা যোগ করছে।