রাজধানীর বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক (ইউএপি)-তে ‘ধর্ম অবমাননার’ অভিযোগে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে দুই শিক্ষককে বহিষ্কার এবং তার মাত্র একদিনের মাথায় বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সোমবার (১৯ জানুয়ারি, ২০২৬) বিকেলে এক জরুরি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্তের কথা জানায়। ক্যাম্পাসে চরম উত্তেজনা এবং নিরাপত্তার অভাব বোধ করায় শিক্ষা কার্যক্রম স্থগিত রাখার এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
Table of Contents
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও ফেসবুক বিতর্ক
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ১০ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের বেসিক সায়েন্স অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশীরের একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে। সেখানে তিনি মুখ ঢেকে পর্দা করার সংস্কৃতির সমালোচনা করেছিলেন। এই পোস্টটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষার্থীরা একে ‘ধর্ম অবমাননা’ হিসেবে চিহ্নিত করে ক্ষোভে ফেটে পড়ে। পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয় ১৮ জানুয়ারি নতুন সেমিস্টারের প্রথম দিনে। একদল বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ, সংবাদ সম্মেলন ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চাপের মুখে পড়ে।
প্রশাসনের তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা ও বহিষ্কার
শিক্ষার্থীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ১৮ জানুয়ারি সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার স্বাক্ষরিত পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে দুই শিক্ষককে বহিষ্কার করা হয়। বহিষ্কৃতরা হলেন সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশীর এবং একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. এ এস এম মহসিন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, পরিস্থিতির সংবেদনশীলতা এবং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অভিযোগের কারণে দ্রুত এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই ঘটনায় বহিষ্কৃত শিক্ষকরা দাবি করেছেন, তাঁদের আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ না দিয়েই অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ‘মব জাস্টিস’ বা মব চাপের মাধ্যমে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত সময়রেখা ও বর্তমান চিত্র:
| তারিখ ও সময় | ঘটনার বিবরণ | বর্তমান অবস্থা |
| ১০ ডিসেম্বর, ২০২৫ | শিক্ষক লায়েকা বশীরের ফেসবুক পোস্ট। | বিতর্কের সূত্রপাত। |
| ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬ | শিক্ষার্থীদের ব্যাপক বিক্ষোভ ও অবস্থান। | বিশ্ববিদ্যালয় উত্তাল। |
| ১৮ জানুয়ারি (সন্ধ্যা) | দুই শিক্ষককে বহিষ্কারের ঘোষণা। | প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ। |
| ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬ | অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা। | শিক্ষা কার্যক্রম স্থগিত। |
| অভিযুক্তের পক্ষ | আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না পাওয়ার দাবি। | আইনি লড়াইয়ের ইঙ্গিত। |
| প্রশাসন | তদন্ত ও নিরাপত্তার খাতিরে ব্যবস্থা। | বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা শান্ত রাখার চেষ্টা। |
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের পাল্টাপাল্টি অবস্থান
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের একাংশের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা কেবল ধর্মীয় বিষয়ে বিতর্কিত মন্তব্যই করেননি, বরং তাঁদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষপাতেরও অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, অনেক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সমাজ এই বহিষ্কারের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, এটি মুক্তবুদ্ধি চর্চার ওপর আঘাত এবং একটি বিশেষ মহলের ‘ট্যাগিং’ ও ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরির ফল। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন ছাড়াই এমন বহিষ্কার একটি ভয়ংকর ও স্বৈরাচারী নজির সৃষ্টি করল।
বর্তমান পরিস্থিতি ও অনিশ্চয়তা
সোমবার বিকেল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। সেমিস্টারের শুরুতেই এমন স্থবিরতা একাডেমিক ক্যালেন্ডারে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরিবেশ অনুকূলে না আসা পর্যন্ত ক্যাম্পাস খোলা সম্ভব নয়।
উপসংহার
ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের এই ঘটনাটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় অনুভূতির স্পর্শকাতরতার মধ্যে এক নতুন দ্বন্দ্ব তৈরি করেছে। প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত কি সাময়িক শান্তি বজায় রাখতে সাহায্য করবে নাকি শিক্ষকদের পেশাগত নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলবে, তা এখন বড় বিতর্কের বিষয়।
