বাংলাদেশে ধর্মীয় চরমপন্থার প্রসার উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। অনলাইন ও অফলাইনে উভয় ক্ষেত্রেই চরমপন্থী কার্যক্রম দৃশ্যমান, যা সমাজে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো increasingly যুক্তি, বিতর্ক ও অনুসারীর সংখ্যা বৃদ্ধির মাধ্যমে তাদের প্রভাব বিস্তৃত করছে। কানাডাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেকডেভের ডিসেম্বর ২০২৫-এর “শ্যাডোজ ওভার দ্য ব্যালট” রিপোর্টে দেশের চরমপন্থার গতিশীলতা ও আধিপত্যের বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে।
Table of Contents
অনলাইন ও অফলাইনে চরমপন্থার কার্যক্রম
সেকডেভের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সহিংস চরমপন্থী গোষ্ঠী জন-অসন্তোষ, নারী ইস্যু, ভারতবিরোধিতা, আওয়ামী লীগের অপশাসন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্মের ভূমিকা নিয়ে নতুন ন্যারেটিভ তৈরি করছে। গবেষক ডব্লিউ. ক্রগোল্যাংকির “The Three Pillars of Radicalization” (2019) অনুযায়ী চরমপন্থার তিনটি মূল উপাদান হলো:
নিডস (Needs) – সমাজে ব্যক্তির অভাব, নিরাপত্তাহীনতা ও প্রতিশোধপরায়ণতার সুযোগ সৃষ্টি।
ন্যারেটিভ (Narrative) – প্রয়োজন অনুযায়ী বয়ান গঠন, যা মানুষের মানসিক উত্তেজনা ও পরিচয়সংক্রান্ত ফাঁক পূরণ করে।
নেটওয়ার্ক (Network) – সহমত ও অনুসারীর সংখ্যা বৃদ্ধি করে চরমপন্থার বিস্তার।
গবেষক ডেভিড জ্যাকম্যান তাঁর গ্রন্থ “Syndicates and Societies: Criminal Politics in Dhaka” (2024) উল্লেখ করেছেন, এই সিন্ডিকেটগুলো অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত এবং মানসিক উত্তেজনা বজায় রাখতে সক্ষম। ফিলিপাইনের সাংবাদিক মারিয়া রেসা দেখিয়েছেন, অনলাইন ইমপিউনিটি ধীরে ধীরে অফলাইনে রূপান্তরিত হয়ে দেশের চেক অ্যান্ড ব্যালান্স ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব
বাংলাদেশে ধর্মীয় চরমপন্থার অনলাইন নেটওয়ার্কে সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা ৩ কোটির বেশি। ফেসবুক, টিকটক ও ইউটিউব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তরুণ প্রজন্মকে লক্ষ্য করে অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে।
| প্ল্যাটফর্ম | ব্যবহারকারী সংখ্যা (মিলিয়ন) | লক্ষ্যবস্তু | লক্ষ্যপূর্ণ কার্যক্রম |
|---|---|---|---|
| ফেসবুক | ৬.৪০ | তরুণ সমাজ | অপতথ্য, ভেরিফিকেশনহীন ন্যারেটিভ |
| টিকটক | ৫.৬২ | তরুণ সমাজ | ভিডিও, ডিপফেক, তথ্য বিকৃতি |
| ইউটিউব | ৪.৯৮ | তরুণ সমাজ | সম্পাদিত ভিডিও, প্রোপাগান্ডা |
দেশের মোট জনসংখ্যার ৪৭% ২৫ বছরের নিচে। ফলে প্রায় ১.৫ কোটি তরুণ ভোটারের মধ্যে ভোটের প্রতি অনাস্থা তৈরি হলে চরমপন্থীদের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
চরমপন্থী গোষ্ঠী গণতন্ত্রকে অগ্রহণযোগ্য মনে করে সরাসরি শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নেয়, যেখানে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো ভোট ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধর্মীয় আইন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। সেকডেভের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১৫ হাজার পোস্ট বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে চরমপন্থীরা গণতন্ত্রকে অইসলামিক ও মুসলিম সমাজের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে প্রচার করছে।
তাকফিরিবাদ ও সহিংসতার ঝুঁকি
চরমপন্থী ধর্মীয় গোষ্ঠীর মূল বৈশিষ্ট্য হলো তাকফিরিবাদ, যেখানে ভিন্নমতাবলম্বী মুসলমানদের ধর্মচ্যুত ঘোষণা করা হয়। এতে ‘ভেতরের শত্রু’ ধারণা তৈরি হয় এবং সহিংসতা ন্যায্য হিসেবে প্রচারিত হয়। দেশের কার্যক্রমে তেহরিক-ই–তালিবান ও আল-কায়েদার মতাদর্শের প্রভাব স্পষ্ট।
মোকাবিলার পথ
ধর্মীয় চরমপন্থা মোকাবিলায় একক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, নাগরিক অধিকার ও মানবিক সংস্কৃতির প্রসারই সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার। বিস্তৃত সংলাপ, সমঝোতা, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং বিকল্প আদর্শ প্রচারের মাধ্যমে সহিংসতা হ্রাস করা সম্ভব।
গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের যৌথ দায়িত্ব। এটি সহিংসতার চক্র ভেঙে সামাজিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনে এবং ধর্মীয় চরমপন্থার প্রতিরোধে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।
