দ্বিতীয় বিয়েতে বাধা দেওয়ায় স্ত্রীর মুখে যুবলীগ নেতার ছুরিকাঘাত

নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলায় পারিবারিক কলহের জেরে এক বর্বরোচিত সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। দ্বিতীয় বিয়েতে বাধা প্রদান এবং দাম্পত্য বিরোধের জেরে নিজ স্ত্রীর মুখে ছুরিকাঘাত করার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক যুবলীগ নেতার বিরুদ্ধে। গত বুধবার (২৮ জানুয়ারি) বিকেলে উপজেলার বরকাশিয়া গ্রামে এই নৃশংস ঘটনাটি ঘটে। গুরুতর আহত অবস্থায় ভুক্তভোগী গৃহবধূ সনি আক্তারকে (৩৫) উদ্ধার করে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও দাম্পত্য কলহ

ভুক্তভোগী সনি আক্তার মোহনগঞ্জ উপজেলার গৌড়াকান্দা গ্রামের মৃত সবুজ মিয়ার মেয়ে এবং স্থানীয় একটি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। ২০১০ সালে বরকাশিয়া গ্রামের আব্দুল্লাহ আল মামুন ওরফে সোহাগ মিয়ার সঙ্গে তাঁর পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। দাম্পত্য জীবনে এই দম্পতির দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বেশ কিছুদিন আগে স্বামী সোহাগ মিয়া প্রথম স্ত্রীর কোনো অনুমতি ছাড়াই অন্য এক তরুণীকে বিয়ে করেন। এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর থেকেই তাঁদের সংসারে চরম অশান্তি ও কলহ শুরু হয়। সোহাগ মিয়া মোহনগঞ্জ উপজেলা যুবলীগের সক্রিয় সদস্য হিসেবে পরিচিত।

ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষসমূহ:

বিবরণবিস্তারিত তথ্য
প্রধান অভিযুক্তআব্দুল্লাহ আল মামুন ওরফে সোহাগ মিয়া (উপজেলা যুবলীগ সদস্য)
ভুক্তভোগীসনি আক্তার (শিক্ষক ও তিন সন্তানের জননী)
ঘটনার স্থানবরকাশিয়া গ্রাম, মোহনগঞ্জ, নেত্রকোনা
ঘটনার তারিখ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬ (বুধবার)
আঘাতের ধরনমুখে ছুরিকাঘাত, শ্বাসরোধের চেষ্টা ও শারীরিক নির্যাতন
বর্তমান অবস্থাচিকিৎসাধীন (ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল)

হামলার লোমহর্ষক বর্ণনা

ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোহাগ মিয়া দ্বিতীয় স্ত্রীকে বাড়িতে নিয়ে এলে বিরোধ চরমে পৌঁছায়। নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে সনি আক্তার মোহনগঞ্জ শহরে আলাদা একটি বাসায় বসবাস শুরু করেন এবং উভয় পক্ষ বিবাহ বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। গত বুধবার সকালে বিচ্ছেদের দলিলে সই করার জন্য সনি আক্তার উপস্থিত হলে সোহাগ মিয়া তাঁর ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালান। সনির গলায় ওড়না পেঁচিয়ে টেনেহিঁচড়ে রিকশায় তুলে জোরপূর্বক গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।

সেখানে নিয়ে যাওয়ার পর সনিকে বেধড়ক মারধর করা হয় এবং এক পর্যায়ে ধারালো ছুরি দিয়ে তাঁর মুখে আঘাত করা হয়। এতে তাঁর মুখমণ্ডল মারাত্মকভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়। খবর পেয়ে সনির ছোট ভাই গোলাম মোর্শেদ বোনকে বাঁচাতে ঘটনাস্থলে পৌঁছালে তাঁকেও লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে জখম করা হয়। পরবর্তীতে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে সনি আক্তারকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করে।

ভুক্তভোগী ও পুলিশের বক্তব্য

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সনি আক্তার বিভীষিকাময় সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে বলেন, “দ্বিতীয় বিয়ের প্রতিবাদ করায় সে দীর্ঘদিন ধরে আমাকে নির্যাতন করছিল। সেদিন তালাকের কাগজে সই করার সময় আমাকে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করে। পরে বাড়িতে নিয়ে মুখে ছুরিকাঘাত করে। পুলিশ সময়মতো না পৌঁছালে হয়তো আমি আজ বেঁচে থাকতাম না।”

এদিকে অভিযুক্ত সোহাগ মিয়া তাঁর বিরুদ্ধে আনিত সকল অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন যে, গত কয়েক বছর ধরে সনির সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ নেই এবং এটি তাঁকে ফাঁসানোর একটি ষড়যন্ত্র। তবে মোহনগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাফিজুল ইসলাম হারুন নিশ্চিত করেছেন যে, তাঁরা লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন এবং ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। দোষী ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনতে পুলিশি তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।

পারিবারিক সহিংসতা ও নারীর ওপর এমন পাশবিক আক্রমণের ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহল ও মানবাধিকার কর্মীরা অভিযুক্ত যুবলীগ নেতার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।