রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের সব বড় শহর ও গ্রামে মশার তাণ্ডব এখন দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ। রাজধানীর তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ডে চায়ের দোকান চালানো বিল্লাল হোসেন জানিয়েছেন, “দু’দিকের কয়েল জ্বালালেও মশা নিস্তব্ধ হয় না। দিনের কোন অংশে, রাতে বা দুপুরে, কোথা থেকে কামড়াবে– সেই চিন্তায় বারবার ছটফট করতে হয়।”
পীরেরবাগ রোডের রোকেয়া সরণির বাসিন্দা বাদল সূত্রধর আরও যোগ করেন, “এত মশা জীবনে দেখিনি। শরীরে কামড় লেগে চুলকানি হয়। দোকানে মশা নিয়ন্ত্রণের সরঞ্জাম নেই। ঘরে কয়েল জ্বালানোও এখন নিরাপদ মনে হয় না।”
রাজধানীর এই সমস্যা শুধু ঢাকা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়; চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, রংপুর, ময়মনসিংহ সহ দেশের সব সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও গ্রামে মশার তাণ্ডব ছড়িয়ে পড়েছে।
Table of Contents
দায়িত্বহীনতা ও আইনি পদক্ষেপ
সম্প্রতি একজন আইনজীবী স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে আইনি নোটিশ পাঠান। এক মাসের বেশি সময়েও মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। মাঝে মাঝে ছিটানো ওষুধের পরিমাণ অপ্রতুল এবং এর কার্যকারিতার বিষয়ে সংশয় রয়ে গেছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. মাহবুবুর রহমান তালুকদার জানান, “মশার ওষুধের কার্যকারিতা যাচাইয়ের জন্য আমরা নমুনা সংগ্রহ করি এবং তা আইইডিসিআর-এ পাঠাই। পরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতামত
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, “বেশ কিছুদিন বৃষ্টি না হওয়ায় ড্রেন ও জলাধারগুলোতে পানি জমে গেছে। পচা পানি এবং উষ্ণ আবহাওয়া মশার প্রজননের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করেছে। নিয়মিত মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালানো হলে এই ভয়াবহ পরিস্থিতি হতো না।”
শহরভিত্তিক মশা ও রোগের তথ্য
নিম্নলিখিত টেবিলে বিভিন্ন শহরে মশাবাহিত রোগ এবং সংক্রমণের পরিস্থিতি তুলে ধরা হলো:
| শহর | মশাবাহিত রোগ | আক্রান্ত সংখ্যা | মৃত্যু সংখ্যা | নোটিসযোগ্য মন্তব্য |
|---|---|---|---|---|
| চট্টগ্রাম | ডেঙ্গু | ৬,৩৩৮ | ৪৮ | লার্ভার ঘনত্ব বেড়ে ৭৫.২৯% |
| চট্টগ্রাম | চিকুনগুনিয়া | ৩,৬৮৩ | – | কার্যকর ব্যবস্থা কম |
| রাজশাহী | ডেঙ্গু | ১,৭২০ | ২১ | ফগার মেশিন ও ওষুধের অভাব |
| খুলনা | ডেঙ্গু | ৪৫ | – | ফার্নেস অয়েল মজুত নেই |
| সিলেট | ডেঙ্গু | ২ | – | কর্মী সংকট ও ফগার মেশিন সীমিত |
| রংপুর | – | – | – | ওষুধ কার্যকর নয়, সরঞ্জাম কম |
| ময়মনসিংহ | – | – | – | সাঁড়াশি অভিযান চলছে, ফলাফল কম |
অন্যান্য শহরের পরিস্থিতি:
সিলেট: কর্মী সংকটের কারণে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম সীমিত। এডিস লার্ভা পাওয়া গেছে, যা ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
খুলনা: ফার্নেস অয়েল ও অ্যাডাল্টিসাইড সরবরাহ অনিয়মিত হওয়ায় মশার উপদ্রব বেড়েছে।
রংপুর: মশক নিধনের ওষুধ প্রয়োগ সীমিত, ফগার মেশিনের সংখ্যা কম।
ময়মনসিংহ: নিয়মিত সাঁড়াশি অভিযান চললেও মশা কমছে না।
বগুড়া ও কুমিল্লা: বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও কার্যকর কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে না।
সমাধানের পথ
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, বর্ষার আগে মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস না করলে বিপদ আরও বাড়বে। সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ এবং স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া নাগরিকদের রক্ষা সম্ভব নয়। নাগরিকরা এখন ঘরে-বাইরে মশার প্রতিরোধক ব্যবস্থার উপর নির্ভর করতে বাধ্য। প্রশাসনিক তৎপরতা এবং কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া স্বাস্থ্যঝুঁকি ও জনজীবনে ব্যাঘাত বহুমাত্রিক হয়ে উঠবে।
মশার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিলে শুধুমাত্র জনস্বাস্থ্য রক্ষা হবে না, বরং দেশের দৈনন্দিন জীবন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের উপর প্রভাবও কমে আসবে।
