দেশের গ্যাস সরবরাহ বিপর্যয়ের মুখে

বাংলাদেশের গ্যাস খাত দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন বাড়ানো দেশের জন্য সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। যদিও বিভিন্ন ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত গ্যাস মজুদ থাকার দাবি করা হচ্ছে, তবে সেই মজুদের সঠিকতা এবং বাস্তব উৎপাদনে রূপান্তর কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। একদিকে অনেক কূপ থেকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে নতুন কূপ খনন ও পুনঃখনন থেকে যে বৃদ্ধি আসছে, তা মোট ক্ষতি পূরণ করতে পারছে না।

দেশপেট্রোলিয়াম ও বাপেক্স পরিকল্পনা নিয়েছে কূপ সংখ্যা বৃদ্ধি করার, যেখানে একসময় ৫৮টি কূপের পরিকল্পনা থাকলেও এখন ১০৮টি কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবু উৎপাদন বৃদ্ধির ফলাফল আংশিক ও টেকসই নয়। এটি নির্দেশ করে যে—(ক) মজুদের পরিমাণ কম হতে পারে, অথবা (খ) মজুদ থাকলেও তা থেকে স্থায়ীভাবে উৎপাদন বাড়াতে আমরা ব্যর্থ।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন সমস্যার মূল তিনটি কারণ—বিনিয়োগের ঘাটতি, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব এবং জ্ঞান ও দক্ষতার অভাব। বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ারিং ও অপারেশনাল ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার ঘাটতি স্পষ্ট।

সমস্যার সমাধানে নেওয়া যেতে পারে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ:

১. আন্তর্জাতিক কনসাল্টিং ফার্ম নিয়োগ: ক্ষেত্রগুলোর পুনর্বিন্যাস ও পুনর্মূল্যায়ন করে রোডম্যাপ তৈরি করা।
২. ছোট ও মধ্যম স্তর কাজে লাগানো: বড় স্তরের ওপর থাকা ছোট স্তরগুলো দ্রুত উৎপাদনে আনা।
৩. ছাতক ক্ষেত্র উন্নয়ন: সম্ভাব্য ১ টিসিএফ পর্যন্ত গ্যাসের জন্য প্রযুক্তি ও মূল্যায়ন প্রয়োগ।
৪. অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করা: নতুন ক্ষেত্র ও লাইসেন্সিং দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে করা।
৫. প্রস্তাব ও নীতিগত স্বচ্ছতা: আন্তর্জাতিক কোম্পানির উৎপাদন বৃদ্ধির প্রস্তাব যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা।

বিদ্যমান উৎপাদন ও ভবিষ্যতের চাহিদার চিত্র নিচের টেবিলে দেখানো হলো:

বিষয়বিবরণ
প্রধান উৎপাদন কেন্দ্রবিবিয়ানা, ছোট-মাঝারি কূপ, ছাতক ক্ষেত্র
মোট কূপ পরিকল্পনা১০৮ টি (আগে ৫৮ টি)
উৎপাদন সমস্যাঅনেক কূপ থেকে কম উৎপাদন, নতুন কূপের বৃদ্ধিও ক্ষতি পূরণে অপ্রতুল
প্রধান ঘাটতিবিনিয়োগ, প্রযুক্তি, দক্ষতা
সমাধান পদক্ষেপআন্তর্জাতিক কনসাল্টিং, ছোট স্তর কাজে লাগানো, অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করা
স্বল্পমেয়াদি বিকল্পগ্যাস পুনর্বণ্টন, সিএনজি থেকে এলপিজি রূপান্তর
দীর্ঘমেয়াদি কৌশলনবায়নযোগ্য জ্বালানি, রুফটপ সোলার, নতুন গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র

স্বল্পমেয়াদি জন্য গ্যাস পুনর্বণ্টন, এলপিজি বিকল্প ও শিল্প ও বসতবাড়ির জন্য নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ জরুরি। বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ব্যবহার করে গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমানো যেতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো, আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ও দক্ষতা আনা, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি—এই তিনটি মূল কৌশল গ্রহণ না করলে দেশের গ্যাস খাত বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে। শিল্প প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।