দুর্লভ কুড়া ঈগল খোঁজে আলোকচিত্রী

প্রকৃতির অরণ্যে এক রহস্যময় উপস্থিতি—কুড়া ঈগল। আচরণগত বৈশিষ্ট্যের কারণে ‘জলদস্যু’ নামে পরিচিত এই বিরল পাখিটি শিকার ছিনিয়ে নেওয়ার প্রবণতার জন্য আলাদা খ্যাতি অর্জন করেছে। অ্যাক্সিপিট্রিডি (Accipitridae) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত এ ঈগলটি পলাশ মেছো ঈগল বা প্যালাসের ফিশ ঈগল নামেও পরিচিত। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এটি ব-ওল, কুড়রা কিংবা কুড়র নামে ডাকা হয়। বিস্তৃত আবাসভূমি থাকা সত্ত্বেও সংখ্যায় অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় দেশে এটি মহাবিপন্ন প্রজাতি হিসেবে বিবেচিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে বর্তমানে আনুমানিক মাত্র ৫০ থেকে ১০০টি কুড়া ঈগল টিকে আছে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা (IUCN) এই প্রজাতিটিকে ‘সংকটাপন্ন’ (Endangered) হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। জলাভূমি, নদী ও হাওরাঞ্চল এদের প্রধান আবাসস্থল, যেখানে তারা মাছ ও ছোট জলজ প্রাণী শিকার করে বেঁচে থাকে। কিন্তু জলাভূমি ধ্বংস, দূষণ এবং মানবিক হস্তক্ষেপের কারণে এদের সংখ্যা ক্রমাগত কমে যাচ্ছে।

সম্প্রতি এই দুর্লভ পাখির ছবি তুলতে সক্ষম হয়েছেন ওয়াইল্ডলাইফ আলোকচিত্রী রানা মাসুদ। তার ভাষ্যমতে, রংপুর থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তিনি হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে যান বিরল পাখির সন্ধানে। সেখানেই আকস্মিকভাবে তার ক্যামেরায় ধরা পড়ে কুড়া ঈগল। এই অভিজ্ঞতাকে তিনি জীবনের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

একটি সফল বন্যপ্রাণীর ছবি ধারণের পেছনে কতটা পরিশ্রম ও ত্যাগ জড়িয়ে থাকে, তার জীবন্ত উদাহরণ এই যাত্রা। রমজানের সময় রোজা রেখে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত টানা কয়েকদিন বনাঞ্চলে অবস্থান করেন তিনি। অনেক সময় শুধু পানি ও খেজুর দিয়ে ইফতার সেরে আবার ক্যামেরা হাতে বেরিয়ে পড়েছেন কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তের খোঁজে। পরবর্তীতে শ্রীমঙ্গলের বাইক্কা বিল এলাকায় গিয়ে আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন—তীব্র রোদ, শারীরিক ক্লান্তি ও অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি অপেক্ষা চালিয়ে যান।

এক পর্যায়ে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে সঙ্গীরা তাকে বিশ্রামের পরামর্শ দেন। যদিও সব লক্ষ্য পূরণ সম্ভব হয়নি, তবুও কুড়া ঈগলের ছবি তুলতে পারাকে তিনি নিজের ‘লাইফার’ অর্জন হিসেবে দেখছেন—যা একজন বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রীর জীবনে বিশেষ স্বীকৃতি বহন করে।

নিচে কুড়া ঈগল সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করা হলো—

বিষয়তথ্য
বৈজ্ঞানিক পরিবারAccipitridae
পরিচিত নামকুড়া ঈগল, পলাশ মেছো ঈগল, প্যালাসের ফিশ ঈগল
বাংলাদেশে অবস্থামহাবিপন্ন
বৈশ্বিক অবস্থাসংকটাপন্ন (Endangered)
আনুমানিক সংখ্যা (বাংলাদেশ)৫০–১০০
প্রধান আবাসস্থলনদী, হাওর, জলাভূমি
খাদ্যাভ্যাসমাছ, ছোট জলজ প্রাণী

বন্যপ্রাণী আলোকচিত্র শুধু একটি শখ নয়, বরং এটি ধৈর্য, অধ্যবসায় ও গভীর ভালোবাসার এক অনন্য সমন্বয়। রানা মাসুদের অভিজ্ঞতা সেই সত্যকেই নতুনভাবে তুলে ধরে—যেখানে প্রতিটি সফল ছবির পেছনে লুকিয়ে থাকে দীর্ঘ অপেক্ষা, কঠিন সংগ্রাম এবং প্রকৃতির প্রতি অগাধ মমত্ববোধ।