দুর্দশাগ্রস্ত ব্যাংক পুনর্গঠন সংক্রান্ত আইনি কাঠামোয় নতুন সংশোধনের মাধ্যমে পূর্ববর্তী মালিকদের জন্য এসব ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ পুনরায় গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। সংশোধিত বিধান অনুযায়ী, বর্তমানে একীভূতকরণ ও পুনর্গঠনের আওতায় থাকা ব্যাংকগুলোর শেয়ার, সম্পদ ও দায় পুনরায় গ্রহণের জন্য প্রাক্তন মালিকরা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করতে পারবেন।
এই সংশোধনটি মূলত পাঁচটি দুর্বল ব্যাংকের চলমান একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার ওপর প্রভাব ফেলেছে। ব্যাংকগুলো হলো ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক। পূর্ববর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগের অংশ হিসেবে এসব ব্যাংক একত্র করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের প্রক্রিয়া চলছিল।
নতুন বিধান অনুযায়ী, প্রাক্তন মালিকরা বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন সাপেক্ষে পুনরায় মালিকানা গ্রহণের আবেদন করতে পারবেন। তবে এজন্য তাদের নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে হবে এবং ব্যাংকের আর্থিক দায় পরিশোধ ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের অঙ্গীকার দিতে হবে।
Table of Contents
মালিকানা পুনরুদ্ধারের শর্ত
সংশোধিত ব্যাংক পুনর্গঠন অধ্যাদেশে নতুনভাবে ধারা ১৮এ যুক্ত করা হয়েছে। এই ধারা অনুযায়ী আবেদনকারীদের লিখিত অঙ্গীকার প্রদান করতে হবে, যেখানে তারা সরকারের বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ, নতুন মূলধন সংযোজন এবং ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দেবেন।
এছাড়া তাদের সব আমানতকারী ও ঋণদাতার পাওনা পরিশোধ, বকেয়া কর পরিশোধ এবং ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ কাঠামো পুনর্গঠনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অনুমোদনের পর মোট নির্ধারিত অর্থের কমপক্ষে সাত দশমিক পাঁচ শতাংশ তিন মাসের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে এবং বাকি দুই বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে, যার ওপর দশ শতাংশ সরল সুদ প্রযোজ্য থাকবে।
অনুমোদনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক দুই বছর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম তদারকি করবে। পরবর্তীতে একটি বিশেষ কমিটি চূড়ান্ত পর্যালোচনা সম্পন্ন করবে এবং শর্ত ভঙ্গ হলে অনুমোদন বাতিল করার ক্ষমতা থাকবে।
ব্যাংকগুলোর অবস্থা
নিম্নে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি উপস্থাপন করা হলো—
| ব্যাংকের নাম | পূর্ববর্তী নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠী | বর্তমান অবস্থা |
|---|---|---|
| ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক | এস আলম গ্রুপ | একীভূতকরণ প্রক্রিয়াধীন |
| সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক | এস আলম গ্রুপ | একীভূতকরণ প্রক্রিয়াধীন |
| ইউনিয়ন ব্যাংক | এস আলম গ্রুপ | একীভূতকরণ প্রক্রিয়াধীন |
| গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক | এস আলম গ্রুপ | একীভূতকরণ প্রক্রিয়াধীন |
| এক্সিম ব্যাংক | নাসা গ্রুপ | একীভূতকরণ প্রক্রিয়াধীন |
সরকারের ব্যাখ্যা
অর্থ উপদেষ্টা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ উদ্যোগকে একটি বাজারভিত্তিক সমাধান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, রাষ্ট্র ইতোমধ্যে দুর্বল ব্যাংক খাতে প্রায় আশি হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে এবং ভবিষ্যতে আরও বিপুল অর্থের প্রয়োজন হতে পারে, যা বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় চাপ সৃষ্টি করছে।
তিনি আরও বলেন, নতুন ব্যবস্থায় ব্যাংক পুনর্গঠন এবং দায় পরিশোধের সম্পূর্ণ দায়িত্ব আবেদনকারীদের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। এর ফলে সরকার এবং আমানত সুরক্ষা তহবিলের ওপর আর্থিক চাপ কমবে। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, যোগ্য যেকোনো পক্ষ, শুধু প্রাক্তন মালিক নয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিবেচনায় ব্যাংকের মালিকানা গ্রহণ করতে পারবে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
তবে এই সংশোধনী নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাদের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ ব্যাংক খাত সংস্কারের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ করতে পারে। যেসব মালিকের সময়ে অনিয়ম ও অর্থপাচারের অভিযোগ উঠেছিল, তাদের পুনরায় মালিকানা ফিরে পাওয়ার সুযোগ দেওয়া সংস্কার প্রক্রিয়ার লক্ষ্যকে দুর্বল করে দিতে পারে।
একজন সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ অনুমান করেছেন, পাঁচটি ব্যাংকের জন্য মোট পরিশোধযোগ্য অর্থের পরিমাণ প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। তার মতে, প্রাথমিক সাত দশমিক পাঁচ শতাংশ পরিশোধ তুলনামূলক সহজ হলেও বাকি অর্থ ব্যাংক খাত থেকেই পুনরায় ঋণ নিয়ে পরিশোধের প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
সম্মিলিত ব্যাংকের ভবিষ্যৎ
বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ এখন পুরোপুরি নির্ভর করছে পুনরায় মালিকানা গ্রহণকারীদের সিদ্ধান্তের ওপর। তারা চাইলে ব্যাংকগুলোকে আবার পৃথকভাবে পরিচালনা করতে পারেন, ফলে একীভূত ব্যাংক কার্যত বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। এতে বাজারে এমন বার্তা যেতে পারে যে আর্থিক অনিয়মের জন্য দায়ী ব্যক্তিরাও পুনরায় ব্যাংক মালিকানা ফিরে পেতে সক্ষম।
