দুদক শুরু করেছে সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের অনুসন্ধান

সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের বিরুদ্ধে রাজধানীর নিকুঞ্জ-১ এলাকায় রাষ্ট্রীয় অর্থের অপব্যবহার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগ অনুযায়ী, ব্যক্তিগত আবাসিক এলাকার আশপাশে সাজসজ্জা ও সৌন্দর্যবর্ধনের নামে রাষ্ট্রের প্রায় ২৪ কোটি টাকা ক্ষতিসাধন করা হয়েছে। বিষয়টি ঘিরে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

রোববার (৭ ডিসেম্বর) দুদক মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, অভিযোগের ভিত্তিতেই এই অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “দুদক কখনো ব্যক্তির পরিচয়, পদমর্যাদা বা অতীত অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে অনুসন্ধান করে না। আমাদের কাছে মুখ্য বিষয় হলো অভিযোগের সত্যতা ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের সুরক্ষা।”

দুদক সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর অভিজাত নিকুঞ্জ-১ এলাকার লেকড্রাইভ রোডের ৬ নম্বর প্লটে সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের তিনতলা বিশিষ্ট একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি রয়েছে। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে তিনি সপরিবারে ওই বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। অভিযোগ উঠেছে, ওই বাড়ি এবং এর আশপাশের সরকারি জমি ও অবকাঠামোকে কেন্দ্র করেই বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করা হয়েছে, যার যৌক্তিকতা ও অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়, বাড়ির দুপাশের সড়কে হাঁটার জন্য বিশেষভাবে নির্মিত বাঁধ, নান্দনিক কাঠের ডেক, ঝুলন্ত ব্রিজ এবং খালসংলগ্ন এলাকায় স্থাপিত অত্যাধুনিক ল্যাম্পপোস্ট নির্মাণ করা হয়েছে। এসব অবকাঠামো নির্মাণে সরকারি অর্থ ব্যবহার হলেও সেগুলোর মূল সুবিধাভোগী ছিলেন নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও তার পরিবার—এমন অভিযোগের কথাও অনুসন্ধান নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এটিকে ‘সৌন্দর্যবর্ধন’ নয়, বরং ব্যক্তিগত সুবিধা নিশ্চিত করার প্রয়াস হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

দুদক কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে মনে করছেন, এই প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে ব্যয় নির্ধারণ, টেন্ডার প্রক্রিয়া, অনুমোদন কর্তৃপক্ষ এবং কাজের বাস্তব প্রয়োজনীয়তা—সবকিছু খতিয়ে দেখা জরুরি। বিশেষ করে প্রকল্প অনুমোদনে সরকারি বিধিবিধান মানা হয়েছে কি না এবং প্রকৃত ব্যয় ও দেখানো ব্যয়ের মধ্যে কোনো গরমিল রয়েছে কি না, তা অনুসন্ধানের মূল অংশ হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাবেক রাষ্ট্রপতির মতো উচ্চপদে অধিষ্ঠিত কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে এমন অনুসন্ধান শুরু হওয়া দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনের সমতার ধারণা জোরদার হতে পারে। একই সঙ্গে এটি ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবহারে আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পথ প্রশস্ত করবে বলে তারা মনে করছেন।

নিচের টেবিলে অভিযোগের মূল বিষয়গুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—

বিষয়বিবরণ
অভিযুক্ত ব্যক্তিসাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ
এলাকানিকুঞ্জ-১, লেকড্রাইভ রোড, ঢাকা
অভিযোগের ধরনরাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় ও অবৈধ সম্পদ অর্জন
আনুমানিক ক্ষতিপ্রায় ২৪ কোটি টাকা
আলোচিত নির্মাণকাজবাঁধ, নান্দনিক ডেক, ঝুলন্ত ব্রিজ, ল্যাম্পপোস্ট
অনুসন্ধান সংস্থাদুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)
অনুসন্ধান শুরু৭ ডিসেম্বর

দুদক মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) আরও জানান, অনুসন্ধান শেষে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যও নেওয়া হবে।

সার্বিকভাবে, এই অনুসন্ধান কেবল একটি ব্যক্তিকে ঘিরে নয়; বরং রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জবাবদিহির সংস্কৃতি কতটা কার্যকর—সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অনুসন্ধানের ফলাফল প্রকাশিত হলে বিষয়টি দেশের দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।