সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলার চেঁড়াঘাট ছয় গম্বুজ মসজিদ প্রায় দুই শতকের ইতিহাস বহন করে আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রাচীন মুসলিম স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে পরিচিত এই মসজিদটি স্থানীয় মানুষের কাছে শুধু ধর্মীয় উপাসনালয়ই নয়, বরং এলাকার ঐতিহ্য ও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
উপজেলা সদর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে দমদম এলাকার একটি নৌ-খালের তীর ঘেঁষে ছায়াঘেরা শান্ত পরিবেশে অবস্থিত এই মসজিদ। গ্রামটির নাম চেঁড়াঘাট হলেও স্থানীয়রা একে প্রায়ই ‘কায়েম বিশ্বাসের মসজিদ’ নামে অভিহিত করেন। মসজিদের নামফলকে উল্লেখ আছে, এর নির্মাণকাল বাংলা ১২৬৯ সন, যা ইংরেজি ১৮৬২ সালের সমতুল্য। সে হিসাবে প্রায় ১৬৪ বছর আগে নির্মিত এই স্থাপনাটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে বিবেচিত।
স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে মসজিদটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পাতলা আকৃতির প্রাচীন ইট এবং চুন-সুড়কির গাঁথুনিতে নির্মিত এই স্থাপনাটি প্রায় ১২ শতক জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত। মসজিদটির ছাদ ১০টি পিলারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে এবং এর ওপর রয়েছে ছয়টি গম্বুজ। পাশাপাশি চারপাশে রয়েছে মোট ১০টি মিনার, যা মসজিদটির সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে তুলেছে। মসজিদটির উচ্চতা প্রায় ১৫ ফুট এবং এতে একসঙ্গে শতাধিক মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।
নিচের সারণিতে মসজিদটির প্রধান বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হলো—
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| অবস্থান | চেঁড়াঘাট গ্রাম, কলারোয়া উপজেলা, সাতক্ষীরা |
| নির্মাণকাল | বাংলা ১২৬৯ সন (ইংরেজি ১৮৬২) |
| আয়তন | প্রায় ১২ শতক জমি |
| গম্বুজের সংখ্যা | ৬টি |
| মিনারের সংখ্যা | ১০টি |
| দরজার সংখ্যা | ৭টি |
| পিলার | ১০টি |
| ধারণক্ষমতা | প্রায় ১০০ জন মুসল্লি |
স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, এই মসজিদের নির্মাতা ছিলেন কায়েম বিশ্বাস নামে এক প্রভাবশালী গাঁতিদার। সেই সময় ভারতের মুর্শিদাবাদের জমিদার দুর্গাপদ চৌধুরীর সঙ্গে তার বিরোধের সৃষ্টি হয়। বিরোধের জেরে তিনি প্রাণনাশের হুমকির মুখে পড়েন। পরবর্তীতে পরিস্থিতি শান্ত করতে তিনি ক্ষমা প্রার্থনা করলে জমিদার শর্ত দেন যে তাকে একটি মসজিদ নির্মাণ করতে হবে। সেই শর্ত পূরণ করতেই কায়েম বিশ্বাস কলকাতা থেকে দক্ষ নির্মাণশ্রমিক ও উপকরণ এনে নিজের গ্রাম চেঁড়াঘাটে এই মসজিদ নির্মাণ করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিশিষ্ট লেখক ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মো. আবু নসর তার রচিত ‘কলারোয়া উপজেলার ইতিহাস’ গ্রন্থে এই মসজিদ নির্মাণের ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন। ফলে মসজিদটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব আরও সুস্পষ্ট হয়েছে।
সময়ের প্রবাহে মসজিদটি এখনো ব্যবহৃত হলেও সম্প্রতি এর কিছু সংস্কার ও সম্প্রসারণ কাজ শুরু হয়েছে। নতুন সিঁড়ি নির্মাণ করে সম্প্রসারিত অংশের সঙ্গে মূল কাঠামো যুক্ত করা হচ্ছে, যাতে মুসল্লিদের সুবিধা বাড়ে এবং স্থাপনাটি দীর্ঘদিন সংরক্ষিত থাকে।
স্থানীয় মুসল্লি ও বাসিন্দারা জানান, চেঁড়াঘাট ছয় গম্বুজ মসজিদ কেবল একটি ইবাদতের স্থান নয়, এটি তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক। নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী তারা এর রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে তারা মনে করেন, প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সংরক্ষণ উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি আরও সুরক্ষিত থাকবে।
স্থানীয়দের দাবি, যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিচর্যার মাধ্যমে মসজিদটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী দর্শনীয় স্থানে রূপ দেওয়া সম্ভব। এতে দেশ-বিদেশের পর্যটকরা আকৃষ্ট হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহাসিক নিদর্শন অক্ষুণ্ণ রাখা যাবে।
