দুই মেরুর কূটনীতি: পুতিনকে অভ্যর্থনা, আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সমঝোতা—ভারত কি রাখতে পারবে দুই কূল?

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তিন বছর পর প্রথমবারের মতো দুই দিনের সফরে ভারতে পৌঁছেছেন। ২০২১ সালের ডিসেম্বরের পর এটাই তাঁর প্রথম নয়াদিল্লি সফর। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বিমানবাহিনীর পালাম ঘাঁটিতে পৌঁছানোর পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁকে জাঁকজমকপূর্ণ সামরিক ও কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতায় স্বাগত জানান। শুক্রবার তাদের মধ্যে শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা আছে।

রাশিয়া-ভারত ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট

স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকেই রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ক। অস্ত্র, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং জ্বালানি খাতে রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে ভারতের প্রধান সহযোগী। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনা বাড়ায় মস্কোর উন্নত সামরিক প্রযুক্তি ভারতের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এসআইপিআরইর তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে রাশিয়া থেকে অস্ত্র কেনা কিছুটা কমলেও ভারতীয় বিমানবাহিনী এখনও সবচেয়ে বেশি নির্ভর করে রাশিয়ার এসইউ–৩০ যুদ্ধবিমানের ওপর। এবার পুতিনের সফরে উন্নত যুদ্ধবিমান এসইউ–৫৭ নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনাও উঁকি দিচ্ছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রও ভারতের জন্য অপরিহার্য অংশীদার

অন্যদিকে, নয়াদিল্লির কৌশলগত সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও গত দশকে অভূতপূর্বভাবে গভীর হয়েছে। প্রযুক্তি হস্তান্তর, প্রতিরক্ষা মহড়া, তথ্য আদান–প্রদান এবং বাণিজ্য সহযোগিতায় ওয়াশিংটন এখন এক গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

কিন্তু রাশিয়ার সস্তা তেল কেনার কারণে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে—যা নয়াদিল্লির বড় চাপ হিসেবে দেখা দিয়েছে। ফলে ভারত এখন একইসঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক বন্ধন বজায় রাখা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রয়োজনীয় বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করার কঠিন ভারসাম্য রক্ষা করছে।

ভারতের কূটনৈতিক কৌশল: দুই শক্তির মাঝামাঝি পথ

বিশেষজ্ঞদের মতে, পুতিনকে জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা দিয়ে নয়াদিল্লি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—ভারতের সামনে শুধু ওয়াশিংটন বা বেইজিং নয়, তৃতীয় বিকল্পও রয়েছে। এটি এক ধরনের কূটনৈতিক দর-কষাকষি, যা ভারতের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করে।

রাশিয়া–ভারত বার্ষিক সম্মেলনেও এই বহুমাত্রিক সম্পর্কের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠবে—অস্ত্রচুক্তি, জ্বালানি, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং নতুন নিরাপত্তা সংলাপ এর অংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কচাপ ভারতের সমীকরণে নতুন ঝামেলা

ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত শুল্ক এবং রাশিয়ার কোম্পানি–সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা ভারতের তেল আমদানিকে প্রভাবিত করেছে। ডিসেম্বরেই ভারতের তেল আমদানির পরিমাণ তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নামতে পারে বলে অনুমান।

এ অবস্থায় চীন–ভারত সম্পর্কেও সাম্প্রতিক নরম সুর লক্ষ্য করা গেছে; মোদি সাত বছর পর চীনে একটি সম্মেলনে যোগ দিয়ে বৈশ্বিক মঞ্চে ভারতের কৌশলগত স্বার্থকে নতুনভাবে তুলে ধরেছেন।

ভারতের সামনে কঠিন পথ

বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়ছে—রাশিয়া–চীন জোট একদিকে, যুক্তরাষ্ট্র–ইউরোপ অন্যদিকে। এর মাঝেই ভারত তার বাজার, অবস্থান ও কৌশলগত গুরুত্ব ধরে রেখে দুই পক্ষের সঙ্গেই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।

ভারত কি নিরাপদে এই ভারসাম্য ধরে রাখতে পারবে—তা নির্ভর করবে শুক্রবারের মোদি–পুতিন বৈঠকের ফলাফল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির অগ্রগতির ওপর।