দারিদ্র্যের জাদুকরকে বিদায় দিয়ে নতুন জীবন গড়ো

শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস’র দর্শন অনুযায়ী দারিদ্র্যকে “জাদুঘরে পাঠানো” উচিত। কিন্তু ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার পর, বাস্তবে সেই দর্শন কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। তার সরকারের ১৮ মাসের কার্যকালে দেশের দরিদ্র মানুষের সংখ্যা নতুন করে প্রায় ৩০ লাখ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে ড. ইউনূসকে বড় সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তাকে সর্বজন সমর্থন—এমতাবস্থায় বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ ছাত্র-রাজনৈতিক শক্তি—মিলেছিল। এই সুযোগের মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে সংস্কার, দারিদ্র্য বিমোচন, দুর্নীতি প্রতিরোধ, ব্যবসা-বাণিজ্য স্থিতিশীলকরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা পাচ্ছিলেন। কিন্তু তিনি তা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছেন।

অর্থনৈতিক সূচক এবং ব্যর্থতা

অর্থনীতিবিদ প্রফেসর আব্দুল বায়েস উল্লেখ করেন, “ড. ইউনূসের সময়ে অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে। প্রবাসী আয় ও রিজার্ভ বৃদ্ধি সত্ত্বেও শিল্প, উৎপাদন ও ব্যবসাবাণিজ্যে আস্থা নেই। নতুন বিনিয়োগ নেই, বেকারত্ব ও দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে।”

নীচের টেবিলটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কিছু মূল অর্থনৈতিক সূচক তুলে ধরেছে:

সূচকপরিসংখ্যানমন্তব্য
বেসরকারি বিনিয়োগ২২.৪৮% জিডিপিচার দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন
সরকারি বিনিয়োগ (এডিপি বাস্তবায়ন)১১.৫%গত ১০ বছরে সর্বনিম্ন
খেলাপি ঋণ৩৫.৭৩%বিশ্বে সর্বোচ্চ
সরকারি ঋণের মোট পরিমাণ২৩ লাখ কোটি টাকাবিদায়ের সময়
মূল্যস্ফীতি৮.৫%মজুরি বৃদ্ধির হার ৮.১%-এর নিচে
রিজার্ভ৩৪ বিলিয়ন ডলারপ্রবাসী রেমিট্যান্স বৃদ্ধি প্রধান উৎস

ড. ইউনূসের আমলে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা বিতরণকৃত ঋণের ৩৫.৭৩ শতাংশ। এর ফলে ব্যবসা ও বেসরকারি খাতের ঋণ সবচেয়ে কমে গেছে।

দারিদ্র্য ও সামাজিক পরিস্থিতি

ড. ইউনূস সরকারের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি—গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণ, স্থানীয় সরকার ও প্রশাসন সংস্কার, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন—কোনোটিই পূর্ণ হয়নি। দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, শ্রম আইন লঙ্ঘন, কর সুবিধা প্রদান এবং বিশেষ অনুমোদনের মাধ্যমে গ্রামীণ গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এ সময় দেশে ধর্মীয় সহিংসতা, মব সৃষ্টির মাধ্যমে গণহত্যা এবং সাংবাদিকদের নির্যাতন ঘটেছে।

বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন, ড. ইউনূস যে ‘তিন শূন্য’ (শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব, শূন্য কার্বন নিংসরণ) দর্শনের প্রচারণা করেছেন, তা তার অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাস্তবায়িত হয়নি। বরং দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে।

ড. ইউনূস বিদায়ি ভাষণে রিজার্ভ বৃদ্ধির বিষয়ে গর্ব প্রকাশ করলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি উৎপাদন ক্ষমতা ও সামাজিক উন্নয়নের মূল লক্ষ্য নয়। সচেতন মহলের প্রশ্ন হলো—যখন তিনি আবারও তার পুরনো কর্মে ফিরে যাবেন, তখন কি তিনি এই ‘তিন শূন্য’ অর্জনে বিশ্বকে পুনরায় দৃঢ়তার সঙ্গে মনোযোগ দিতে পারবেন?

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যকাল অর্থনীতি ও সমাজের জন্য একটি বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেয়েছে, যেখানে প্রতিশ্রুতি, সুযোগ ও বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধান স্পষ্টভাবে দেখা যায়।