বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে এক বৈপ্লবিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বাহিনীর নিজস্ব ‘সঞ্জীবন প্রকল্প’-এর মাধ্যমে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে চালু করা হয়েছে বিশেষ জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ অনলাইনে এই আধুনিক ও সময়োপযোগী প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে বাহিনীর সাধারণ সদস্যরা এখন বিদেশের মাটিতে দক্ষ কর্মী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ পাবেন।
প্রশিক্ষণের বিশেষত্ব ও কাঠামো
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মহাপরিচালক জানান, এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচিটি প্রচলিত গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। এটি একটি ‘হাইব্রিড’ মডেলের নিবিড় প্রশিক্ষণ, যা সম্পূর্ণ আবাসিক সুবিধাসহ হাতে-কলমে ভাষা শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেয়। ৯০ দিন মেয়াদী এই কোর্সে প্রশিক্ষণার্থীদের কেবল জাপানি ভাষাই নয়, বরং জাপানের শিষ্টাচার ও কর্মক্ষেত্রের সংস্কৃতি সম্পর্কেও পূর্ণাঙ্গ ধারণা দেওয়া হবে। এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আগামী ২১ এপ্রিল পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে চলবে।
প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মূল তথ্য ও বিন্যাস:
| বিষয়ের বিবরণ | বিস্তারিত তথ্য ও পরিসংখ্যান |
| প্রকল্পের উদ্দেশ্য | ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট বা বৈদেশিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধি। |
| মডেল ও মেয়াদ | নিবিড় আবাসিক ও হাইব্রিড মডেল; ৯০ দিন। |
| অংশগ্রহণকারী | ৫টি কেন্দ্রে মোট ২০০ জন (প্রতি কেন্দ্রে ৪০ জন)। |
| প্রশিক্ষণ কেন্দ্র | গাজীপুর (একাডেমি), খুলনা, চট্টগ্রাম, বগুড়া ও রংপুর। |
| কারিগরি সহযোগী | আন্তর্জাতিক দক্ষতা উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান ‘স্কিল আপ’ (Skill Up)। |
| আর্থিক সহায়তা | কল্যাণ ট্রাস্টের মাধ্যমে উচ্চতর পরীক্ষার ফি প্রদান। |
৩ কোটি মানুষের সমৃদ্ধির লক্ষ্য
মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ তাঁর বক্তব্যে বাহিনীর সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “৬০ লাখ সদস্যের এই বিশাল বাহিনীর সাথে তাঁদের পরিবারের প্রায় ৩ কোটি মানুষ জড়িয়ে আছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করা আমাদের অন্যতম কৌশলগত লক্ষ্য।” তিনি আরও জানান, প্রাথমিক প্রশিক্ষণ শেষে যারা জাপানি ভাষার উচ্চতর সার্টিফিকেশন (যেমন- JLPT) অর্জন করতে আগ্রহী হবেন, তাঁদের পরীক্ষার ফি আনসার-ভিডিপি কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে প্রদান করা হবে, যা সাধারণ সদস্যদের জন্য একটি বড় আর্থিক সুবিধা।
কৌশলগত অংশীদারিত্ব ও বাস্তবায়ন
এই প্রকল্প বাস্তবায়নে গত ১৫ জানুয়ারি আনসার-ভিডিপি এবং আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘স্কিল আপ’-এর মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। ‘স্কিল আপ’ মূলত বিশ্ববাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে অভিজ্ঞ। বর্তমানে গাজীপুরস্থ আনসার-ভিডিপি একাডেমি ছাড়াও দেশের আরও চারটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক কেন্দ্রে এই প্রশিক্ষণ একযোগে পরিচালিত হচ্ছে। অভিজ্ঞ জাপানি ভাষা প্রশিক্ষকদের মাধ্যমে প্রশিক্ষণার্থীদের শ্রবণ, পঠন ও কথন—এই তিন ক্ষেত্রেই পারদর্শী করে তোলা হচ্ছে।
বিশ্ববাজারে সম্ভাবনা ও গুরুত্ব
জাপানের শ্রমবাজারে বর্তমানে কেয়ার-গিভার, নির্মাণ শিল্প এবং কৃষি খাতে বিপুল পরিমাণ দক্ষ জনশক্তির চাহিদা রয়েছে। জাপানি ভাষায় পারদর্শিতা থাকলে আনসার-ভিডিপির সুশৃঙ্খল সদস্যরা সহজেই এই সুযোগ লুফে নিতে পারবেন। এটি কেবল ব্যক্তিগত উন্নয়ন নয়, বরং দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে এবং বেকারত্ব দূর করতে এক মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।
উপসংহার
আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর এই আধুনিক চিন্তা ও ‘সঞ্জীবন প্রকল্প’ বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি খাতে এক নতুন প্রাণসঞ্চার করেছে। সামরিক শৃঙ্খলার সাথে ভাষাগত দক্ষতা যুক্ত হওয়ার ফলে এই সদস্যরা জাপানি নিয়োগকর্তাদের কাছে বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা পাবেন। সরকারের এই ইতিবাচক পদক্ষেপ দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও মজবুত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।









