রাজধানীর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে পৃথক তিনটি ছাত্র ও গণ-আন্দোলনের জেরে সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসেই স্থবির হয়ে পড়ে ঢাকা মহানগরীর একটি বড় অংশ। গতকাল সকাল থেকে ফার্মগেট, কাওরান বাজার ও শাহবাগ এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন দাবিতে হাজারো মানুষ রাজপথে অবস্থান নিলে দীর্ঘস্থায়ী যানজট ও জনভোগান্তির সৃষ্টি হয়। একদিকে মোবাইল ব্যবসায়ীদের এনইআইআর বিরোধী বিক্ষোভ, অন্যদিকে তেজগাঁও কলেজের ছাত্র হত্যার বিচার এবং সবশেষে শাহবাগে হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে ‘মার্চ ফর ইনসাফ’ কর্মসূচির কারণে দিনভর উত্তপ্ত ছিল রাজপথ।
কাওরান বাজারে ব্যবসায়ী-পুলিশ সংঘর্ষ
ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) ব্যবস্থা চালুর প্রতিবাদে এবং বিটিআরসি ভবনে হামলার ঘটনায় আটক ব্যবসায়ীদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে কাওরান বাজার মোড় অবরোধ করেন মোবাইল ব্যবসায়ীরা। মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ (এমবিসিবি)-এর ব্যানারে ব্যবসায়ীরা তাঁদের স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে সড়কে বসে পড়েন। বেলা ১১টার দিকে পুলিশ তাঁদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এই নিয়ম চালুর ফলে তাঁরা ব্যবসায়িকভাবে সর্বস্বান্ত হয়ে পরিবার নিয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছেন।
ফার্মগেটে খুনিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে বিক্ষোভ
একই সময়ে ফার্মগেট মোড় অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থীরা। গত ৬ ডিসেম্বর ছাত্রাবাসে সংঘর্ষে গুরুতর আহত হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী ছাত্র সাকিবুল হাসান রানার খুনিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে এই কর্মসূচি পালন করা হয়। ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে’—এমন স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে ফার্মগেট এলাকা। পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দ্রুত বিচারের আশ্বাস দিলেও মূল আসামিকে গ্রেপ্তার না করা পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা রাজপথ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান।
গতকালকের আন্দোলনের প্রধান কারণ ও প্রভাবসমূহ নিচের সারণিতে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
রাজধানীর পৃথক তিনটি আন্দোলনের মূল পর্যালোচিত বিষয়সমূহ
| আন্দোলনের মূল স্থান | আন্দোলনকারী | বিক্ষোভের প্রধান কারণ | বর্তমান পরিস্থিতি ও মন্তব্য |
| কাওরান বাজার | মোবাইল ব্যবসায়ী সমাজ | এনইআইআর ব্যবস্থা বাতিল ও আটক সহকর্মীদের মুক্তি। | পুলিশি অ্যাকশনে ছত্রভঙ্গ, এলাকায় তীব্র উত্তেজনা। |
| ফার্মগেট | তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থী | সাকিবুল হাসান রানা হত্যাকাণ্ডের বিচার ও আসামিদের গ্রেপ্তার। | ২ জন আটক, মূল আসামি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। |
| শাহবাগ | ইনকিলাব মঞ্চ ও হাদি মঞ্চ | শরীফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার ও ইনসাফ কায়েম। | মার্চ ফর ইনসাফ কর্মসূচি চলমান, ব্যাপক জনসমাগম। |
শাহবাগে মার্চ ফর ইনসাফ
দুপুরের দিকে শাহবাগ মোড়ে জমায়েত হয় হাদি মঞ্চের শত শত নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। ইনকিলাব মঞ্চের পূর্ব ঘোষিত ‘মার্চ ফর ইনসাফ’ কর্মসূচির কারণে শাহবাগ থেকে প্রেস ক্লাব ও বাংলামটর অভিমুখে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আন্দোলনকারীরা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে হাদি হত্যার প্রকৃত রহস্য উন্মোচন ও ন্যায়বিচারের দাবি জানান।
ডিএমপি’র তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান জানিয়েছেন, জনভোগান্তি সৃষ্টি করে সরকারকে চাপে ফেলার কোনো পরিকল্পনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সফল হতে দেবে না। তবে শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে পুলিশ রানা হত্যা মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। রাজধানীর এই ত্রিমুখী অচলবস্থায় কর্মস্থলে যাওয়া সাধারণ মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসে বসে থাকতে হয়েছে, এমনকি মুমূর্ষু রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সকেও বিকল্প পথে গন্তব্যে পৌঁছাতে দেখা গেছে।
