তেহরানে ভয়াবহ রাতের বিমান হামলা

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরানের রাজধানী তেহরান সম্প্রতি এক ভয়াবহ রাত পার করেছে। গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত একের পর এক বিমান হামলা ও বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে শহরের বিভিন্ন এলাকা। বহু বাসিন্দা আতঙ্কে ঘুম থেকে জেগে ওঠেন, আর বিস্ফোরণের শব্দে রাজধানীর আকাশজুড়ে তৈরি হয় যুদ্ধাবস্থার মতো পরিস্থিতি। এই হামলার ফলে অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং হাজারো পরিবার নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগের মধ্যে পড়েছে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই হামলা বৃহত্তর সামরিক অভিযানের অংশ, যা ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে এই অভিযান পরিচালনা করছে বলে দাবি করা হয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ‘অপারেশন লায়নস রোর’ নামে পরিচিত এই অভিযান সাম্প্রতিক দশকগুলোতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সরাসরি সামরিক সংঘাতগুলোর একটি। অনেক বিশ্লেষক আশঙ্কা করছেন, এটি ধীরে ধীরে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিস্তৃত আঞ্চলিক সংকটে পরিণত হতে পারে।

বিস্ফোরণের শব্দে জেগে ওঠে নগরী

তেহরানের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সারা রাত ধরে বিস্ফোরণের তীব্র শব্দ শোনা গেছে। অনেক বাসিন্দা জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের অভিঘাতে ভবনের জানালা কেঁপে ওঠে এবং শকওয়েভ আশপাশের আবাসিক এলাকাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে।

একজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, সবচেয়ে তীব্র হামলার সময় পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। তার ভাষায়, “মনে হচ্ছিল যেন প্রতিটি বিস্ফোরণে বুকের ভেতর পর্যন্ত কেঁপে উঠছে।” এই বক্তব্য তেহরানের বহু পরিবারের আতঙ্ক ও অসহায়তার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।

রাতভর শহরের আকাশে যুদ্ধবিমানের গর্জন, বিমান হামলার সতর্কতা সাইরেন এবং অ্যাম্বুলেন্স ও দমকল বাহিনীর গাড়ির সাইরেন মিলিয়ে রাজধানীতে এক ধরনের যুদ্ধকালীন পরিবেশ তৈরি হয়। বহু দশক ধরে তেহরান এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

নিরাপত্তার আশঙ্কায় অনেক বাসিন্দা জানালার কাচ ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে টেপ লাগিয়ে রাখেন। অনেক পরিবার ঘরের করিডর, বেজমেন্ট বা ভূগর্ভস্থ স্থানে আশ্রয় নেয়। একই সঙ্গে তারা টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে পরিস্থিতির সর্বশেষ খবর জানার চেষ্টা চালিয়ে যায়।

সামরিক লক্ষ্যবস্তু হলেও ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষ

পশ্চিমা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামলার মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের অস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত সামরিক বা শিল্প স্থাপনা। তবে এসব স্থাপনার আশপাশে ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা থাকায় সাধারণ মানুষও এর প্রভাব থেকে রেহাই পায়নি।

তেহরানের আশপাশের কয়েকটি তেল ডিপো, শিল্পকারখানা এবং গুদামঘর লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে বলে জানা গেছে। এসব স্থাপনায় আগুন লাগার ফলে আকাশে ঘন কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, শিল্পকারখানায় আগুন লাগলে বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা বায়ুদূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে।

বাড়ছে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা

মানবাধিকার সংগঠন ও বিভিন্ন সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি দ্রুত বাড়ছে। অব্যাহত বিমান হামলা ও পাল্টা হামলার কারণে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।

সূচকআনুমানিক তথ্য
ইরানে বেসামরিক নিহতপ্রায় ১২০০–১৩০০ জন
আহত বেসামরিককয়েক হাজার
বড় আকারের সামরিক অভিযান শুরু২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শহরতেহরান, তাবরিজসহ অন্যান্য নগর

বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাতের সময় হাসপাতাল, স্কুল এবং আবাসিক ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

রাজধানীর স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত

বিমান হামলার প্রভাব তেহরানের দৈনন্দিন জীবনেও পড়েছে। অনেক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও জনসমাগম বাতিল করা হয়েছে। নিরাপত্তাজনিত কারণে কিছু সময়ের জন্য ইন্টারনেট সংযোগও সীমিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি এড়াতে অনেক বাসিন্দা রাজধানী ছেড়ে ছোট শহর বা গ্রামাঞ্চলে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তাদের ধারণা, তুলনামূলকভাবে এসব এলাকায় বিমান হামলার আশঙ্কা কম। তবে অনেক পরিবার অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, কর্মসংস্থান কিংবা বয়স্ক স্বজনদের কারণে তেহরান ছেড়ে যেতে পারছে না।

আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা

তেহরানে সাম্প্রতিক এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান ইতোমধ্যে পাল্টা হামলার অংশ হিসেবে ইসরাইল ও উপসাগরীয় অঞ্চলের কিছু স্থানে আঘাত হেনেছে। ফলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়ে বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তবে তেহরানের সাধারণ মানুষের কাছে কূটনৈতিক কৌশল বা সামরিক বিশ্লেষণের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিদিনের নিরাপত্তা। অনেক বাসিন্দাই বলছেন, শহরটি এখন ভয়াবহ রাত আর অনিশ্চিত দিনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাদের একটাই আশা—যেন দ্রুত সহিংসতার অবসান ঘটে এবং তেহরান আবার শান্ত স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারে।