তেল কূটনীতিতে চাপে মোদি সরকার

নরেন্দ্র মোদি সরকারের জন্য আন্তর্জাতিক রাজনীতি ক্রমেই এক কঠিন কূটনৈতিক সমীকরণে পরিণত হচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ও বর্তমান প্রভাবশালী রাজনীতিক ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রবল চাপ, অন্যদিকে বহুদিনের পরীক্ষিত মিত্র রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক—এই দুই মেরুর টানাপোড়েনে ভারত কার্যত ‘চিড়েচ্যাপ্টা’ অবস্থায় পড়েছে। বিশেষ করে রুশ তেল আমদানি ঘিরে সাম্প্রতিক বক্তব্য ও পাল্টা প্রতিক্রিয়া নয়াদিল্লির জন্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

চলতি সপ্তাহে ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির মধ্যে স্বাক্ষরিত এক বাণিজ্য চুক্তিকে কেন্দ্র করে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ভারত রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে ভারত যুক্তরাষ্ট্র এবং সম্ভবত ভেনেজুয়েলা থেকে বেশি পরিমাণে তেল আমদানি করবে। তবে এই দাবিকে কার্যত গুরুত্বহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে মস্কো।

ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ স্পষ্ট ভাষায় জানান, ভারত কোনো একক দেশের ওপর নির্ভরশীল নয় এবং বহু বছর ধরেই বিভিন্ন দেশ থেকে তেল আমদানি করে আসছে। তাঁর মতে, তেলের উৎসে বৈচিত্র্য আনা ভারতের নিজস্ব নীতি, এতে নতুন বা অস্বাভাবিক কিছু নেই। একই সঙ্গে তিনি বলেন, রাশিয়া এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এমন কোনো বার্তা পায়নি যে ভারত রুশ তেল কেনা পুরোপুরি বন্ধ করবে।

ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়ার ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও ভারত সেই পথ অনুসরণ করেনি। বরং মস্কোর কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য ছাড়ে অপরিশোধিত তেল কিনে নিজের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। বর্তমানে ভারত প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেল রুশ তেল আমদানি করে, যা মোট আমদানিকৃত তেলের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করলেও নয়াদিল্লি রুশ তেল কেনা অব্যাহত রেখেছে।

রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা এই তেল বাণিজ্যকে উভয় দেশের জন্যই লাভজনক বলে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষায়, ভারত–রাশিয়া হাইড্রোকার্বন সহযোগিতা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করছে এবং মস্কো এই অংশীদারত্ব আরও গভীর করতে আগ্রহী।

রুশ গণমাধ্যম ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক নয়, প্রযুক্তিগতও। রাশিয়ার ‘ইউরালস’ গ্রেডের তেল তুলনামূলকভাবে ভারী ও সালফারসমৃদ্ধ, যা ভারতের অনেক শোধনাগারের নকশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিপরীতে মার্কিন তেল সাধারণত হালকা প্রকৃতির। ফলে হঠাৎ করে রুশ তেলের পরিবর্তে সম্পূর্ণভাবে মার্কিন তেল ব্যবহার করতে গেলে শোধনাগার সংস্কার, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ঝুঁকি—সব মিলিয়ে ভারতের জন্য তা হবে ব্যয়বহুল ও জটিল সিদ্ধান্ত।

নিচের সারণিতে ভারতের তেল আমদানির বর্তমান চিত্র তুলে ধরা হলো:

সূচকতথ্য
দৈনিক মোট তেল আমদানিপ্রায় ৪৫–৫০ লাখ ব্যারেল
রুশ তেলের দৈনিক আমদানিপ্রায় ১৫ লাখ ব্যারেল
মোট আমদানিতে রুশ তেলের অংশএক-তৃতীয়াংশের বেশি
প্রধান বিকল্প উৎসমধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্র
রুশ তেলের বৈশিষ্ট্যভারী, সালফারযুক্ত

সব মিলিয়ে, ভারতের সামনে চ্যালেঞ্জ একটাই—কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ সামলে নিজের জ্বালানি নিরাপত্তা ও দীর্ঘদিনের রুশ অংশীদারত্ব বজায় রাখা যায়। এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করাই আগামী দিনে মোদি সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা হয়ে উঠছে।