ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) পাকিস্তানের প্রতীকী পতাকা পদদলনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে। বিজয়ের মাস ডিসেম্বরকে সামনে রেখে শিক্ষার্থীদের একাংশ এই উদ্যোগ গ্রহণ করে, যার মাধ্যমে তারা মুক্তিযুদ্ধ, শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসকে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেয়। ঘটনাটি শুধু প্রতিবাদই নয় বরং বাংলাদেশের জাতীয় চেতনা ও পরিচয়ের সঙ্গে জড়িত একটি গভীর বার্তা বহন করে।
রবিবার রাত এবং সোমবার বিকেল—দুই দিনে ঢাবির তিনটি আবাসিক হলে এই প্রতীকী প্রতিবাদ অনুষ্ঠিত হয়। জিয়াউর রহমান হল, বিজয় একাত্তর হল এবং সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের প্রবেশপথে বড় আকারে পাকিস্তানের পতাকা আঁকা হয়। প্রতীকী সেই পতাকার ওপরে লেখা ছিল— “No Compromise with Razakar”। এরপর শিক্ষার্থীরা একত্রে সেই চিহ্নিত পতাকার ওপর দিয়ে হেঁটে পাকিস্তানবিরোধী প্রতীকী প্রতিবাদ জানান। এই হাঁটার প্রতিটি ধাপ যেন অতীতের বর্বরতা, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংসতা এবং তাদের সহযোগী রাজাকার–আলবদরদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থানের প্রতীক হয়ে ওঠে।
প্রতিবাদের ছবি মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে পোস্ট করে লেখেন যে, এই প্রতীকী প্রতিবাদ বর্তমান প্রজন্মের দেশপ্রেম, ইতিহাস সচেতনতা এবং স্বাধীনতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ। যদিও পরে হলগুলোর সামনে আঁকা পতাকাগুলো আর দেখা যায়নি—তবে প্রতিবাদের বার্তা, প্রতীকী অর্থ এবং শিক্ষার্থীদের অবস্থান ইতোমধ্যেই সমাজমাধ্যমে নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ঢাবির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী কারিব চৌধুরী বলেন, “বিজয়ের মাসে এই উদ্যোগ মূলত শহীদদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতার প্রকাশ। যারা ত্যাগ, রক্ত ও আত্মোৎসর্গের মধ্য দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন—তাদের প্রতি সম্মান জানাতেই আমাদের এই প্রতীকী প্রতিবাদ।”
তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা, নারীদের ওপর নির্যাতন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের নৃশংসভাবে হত্যার ইতিহাস বাংলাদেশের অস্তিত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই দেশদ্রোহী রাজাকার–আলবদরদের ভূমিকার স্মরণ করিয়ে সমাজকে সতর্ক করা প্রয়োজন।
কারিব চৌধুরী আরও যোগ করেন, “এই প্রতিবাদ ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং মানবতার প্রতি আমাদের অঙ্গীকার। ঢাবির এই উচ্চারণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার বার্তা দেবে।”
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এই ধরনের প্রতীকী প্রতিবাদ একটি স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রকাশ। বিশেষ করে যখন তা ইতিহাস, রাষ্ট্রচেতনা এবং জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। অনেকের মতে, পাকিস্তানের পতাকা পদদলন সরাসরি রাজনৈতিক কোনো কর্মসূচি নয়; বরং এটি স্বাধীনতার মূল্য স্মরণ করানোর একটি সচেতন উদ্যোগ।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে পাকিস্তানবিরোধী বিদ্বেষ কোনো সাম্প্রতিক আবেগ নয় বরং দীর্ঘদিনের শোষণ, নিপীড়ন ও রক্তাক্ত স্মৃতির বহিঃপ্রকাশ। ঢাবির শিক্ষার্থীদের এই কর্মসূচি তাই সেই বেদনাবিধুর ইতিহাসকেই নতুন প্রজন্মের সামনে আবার স্মরণ করিয়ে দিল।
