ঢাকায় পা রাখছেন নতুন মার্কিন দূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন

বাংলাদেশের রাজনীতি ও কূটনীতির এক চূড়ান্ত সন্ধিক্ষণে নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন আগামী ১২ জানুয়ারি ঢাকা পৌঁছাতে যাচ্ছেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সৃষ্ট ব্যাপক রাজনৈতিক আগ্রহের মধ্যেই নতুন রাষ্ট্রদূতের এই মিশন শুরু হতে যাচ্ছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, ১২ জানুয়ারি ঢাকায় পা রাখার পর তিনি দ্রুততম সময়ের মধ্যে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে তাঁর পরিচয়পত্র পেশ করবেন। এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে বর্তমানে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের মধ্যে নিবিড় সমন্বয় ও প্রস্তুতিমূলক বৈঠক চলছে।

ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের এই সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তিনি এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিচ্ছেন যখন বাংলাদেশে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ইতোমধ্যে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে এবং প্রার্থীরা তাঁদের মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ক্রিস্টেনসেনকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং নবনির্বাচিত সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের মতো জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করতে হবে।

নিচে নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বর্ণাঢ্য কর্মজীবন ও দক্ষতার একটি চিত্র তুলে ধরা হলো:

মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের সংক্ষিপ্ত প্রোফাইল

বিষয়ের ক্ষেত্রবিস্তারিত তথ্য ও অভিজ্ঞতা
পূর্ণ নাম ও পদমর্যাদাব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন (সিনিয়র ফরেন সার্ভিস অফিসার)
সিনেট অনুমোদন২০ ডিসেম্বর ২০২৫ (মার্কিন সিনেট কর্তৃক চূড়ান্ত)
পেশাগত অভিজ্ঞতারিয়াদ, ম্যানিলা, হো চি মিন সিটি ও সান সালভাদর মিশন
ঢাকায় পূর্ব অভিজ্ঞতারাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাউন্সেলর (২০১৯-২১)
কৌশলগত অভিজ্ঞতামার্কিন স্ট্র্যাটেজিক কমান্ডের পররাষ্ট্রনীতি উপদেষ্টা (২০২২-২৫)
ভাষাগত দক্ষতাস্প্যানিশ, জার্মান, ভিয়েতনামি (দক্ষ) ও জাপানি (শিক্ষানবিশ)
শিক্ষাগত যোগ্যতাঅর্থনীতিতে স্নাতক, পরিসংখ্যান ও জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে মাস্টার্স
বিশেষ বিশেষত্বচীন ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল বিষয়ক প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ

ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন ঢাকার বিদায়ী রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন। পিটার হাস গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে তাঁর দায়িত্ব শেষ করার পর থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে ট্রেসি অ্যান্ড জ্যাকবসন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স হিসেবে রুটিন দায়িত্ব পালন করছিলেন। ক্রিস্টেনসেন এর আগে ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাউন্সেলর হিসেবে কর্মরত ছিলেন, ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও জনমানুষের আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে তাঁর সম্যক ধারণা রয়েছে।1

 

গত অক্টোবরে মার্কিন সিনেটের ফরেন রিলেশন্স কমিটির শুনানিতে ক্রিস্টেনসেন বাংলাদেশের গুরুত্ব ও তাঁর ভবিষ্যৎ লক্ষ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ বর্তমানে একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে’ রয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার বিপ্লব ১৫ বছরের একঘেয়ে শাসনের অবসান ঘটিয়েছে এবং নতুন গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের পথে যাত্রা শুরু করেছে।” তিনি আরও জানান যে, রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালনকালে তিনি মার্কিন ব্যবসায়িক উন্নতি, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তীকালীন ও পরবর্তী সরকারের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করবেন। এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং সামরিক ঝুঁকির বিষয়েও মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন।

দুই দশকেরও বেশি সময়ের কূটনৈতিক ক্যারিয়ার সম্পন্ন এই কর্মকর্তা কেবল একজন দক্ষ কূটনীতিকই নন, বরং একজন পারদর্শী ভাষাবিদও বটে। তিনি স্প্যানিশ, জার্মান ও ভিয়েতনামি ভাষায় সাবলীল কথা বলতে পারেন এবং ফরাসি ও জাপানি ভাষাতেও তাঁর দখল রয়েছে। ম্যানিলা থেকে রিয়াদ—বিশ্বের নানা প্রান্তে দায়িত্ব পালন করার বিশাল অভিজ্ঞতা তাঁকে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় যোগ্য করে তুলেছে। ১২ জানুয়ারি তাঁর আগমনের পর বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন এক অধ্যায় সূচিত হবে বলে আশা করছেন বিশ্লেষকগণ।