বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে ড. আহমদ শরীফ ছিলেন এক উজ্জ্বল ও প্রতিবাদী নক্ষত্র। মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য, সমাজ ও সংস্কৃতির গভীর বিশ্লেষণ এবং যুক্তিবাদী, নির্ভীক মননের জন্য তিনি দেশ-বিদেশে সমানভাবে সম্মানিত। তাঁর শিক্ষকতা ও গবেষণার ধারা এক জীবন্ত বুদ্ধিজগত তৈরি করেছিল, যেখানে সততা, মুক্তচিন্তা ও ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা ছিল কেন্দ্রবিন্দু।
Table of Contents
শৈশব ও শিক্ষাজীবন
ড. আহমদ শরীফের জন্ম ১৯২১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে। তার পরিবার ছিল সাহিত্যিক ঐতিহ্যের ধারক; চাচা প্রখ্যাত পণ্ডিত আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। শৈশব থেকেই তিনি পুঁথি, পাণ্ডুলিপি এবং সাময়িকীর সঙ্গে পরিচিত হয়ে ঐতিহ্য ও সাহিত্যের গভীর ভালোবাসা গড়ে তুলেন।
চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ১৯৪০ সালে আইএ এবং ১৯৪২ সালে বিএ সম্পন্ন করার পর তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। সেখানে তাঁর প্রিয় শিক্ষক ছিলেন মোহিতলাল মজুমদার ও গণেশচরণ বসু। তাঁদের প্রেরণায় তিনি গবেষণামুখী ও বিশ্লেষণধর্মী চিন্তাধারার অধিকারী হন।
কর্মজীবন ও শিক্ষাজীবন
কর্মজীবনের শুরুতে ড. আহমদ শরীফ দুর্নীতি দমন বিভাগে যোগ দিলেও ১৯৪৫ সালে অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে চাকরি ত্যাগ করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি কুমিল্লার নওয়াব ফয়জুন্নেসা কলেজ, ফেনী কলেজে শিক্ষকতা করেন এবং কিছু সময় রেডিও পাকিস্তানে কাজ করেন। ১৯৫০ সালের ডিসেম্বরে তিনি গবেষণা সহকারী হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে যোগ দেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর দায়িত্ব ছিল আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের দানকৃত ৫৯৭টি অমূল্য পুঁথির রক্ষণাবেক্ষণ। এই পুঁথি সংরক্ষণকে তিনি গবেষণার মাধ্যমে মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের নতুন ব্যাখ্যা ও প্রেক্ষাপটে তুলে ধরেন।
তাঁর শিক্ষকতা জীবনের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল:
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| শিক্ষাজীবন | ৩৪ বছর শিক্ষকতা |
| প্রভাব | শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞানচেতনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা বৃদ্ধি |
| উল্লেখযোগ্য ছাত্র | হুমায়ুন আজাদ সহ অনেকে |
| প্রধান রচনা | ‘বাঙালি ও বাঙলা সাহিত্য’ (প্রথম খণ্ড ১৯৭৮, দ্বিতীয় খণ্ড ১৯৮৩) |
| বিশেষত্ব | যুক্তিনিষ্ঠ বিশ্লেষণ, ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি, নির্মোহ ভাষ্য |
অবসরে গবেষণা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
১৯৮৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসরগ্রহণের পর তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নজরুল অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। শিক্ষক, গবেষক, প্রাবন্ধিক—সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে তিনি ছিলেন মুক্তবুদ্ধির প্রতীক। ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার ও বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্বের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল দৃঢ় ও স্পষ্ট।
স্মরণ
২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯ সালে ড. আহমদ শরীফ প্রয়াত হলেও তাঁর চিন্তা, যুক্তি ও সাহসী উচ্চারণ আজও প্রাসঙ্গিক। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন—সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোই বুদ্ধিজীবীর প্রথম দায়িত্ব। তাঁর অবদান বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য এক অমোঘ দিশারী হিসেবে রয়ে গেছে।
শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করি এই প্রজ্ঞাবান মনীষীকে, যিনি ছিলেন এক সত্যিকারের জ্ঞানতাপস।
