স্টিক ও বলের ছন্দময় ঠুকঠাক শব্দে গত কয়েক দিন যেন অন্য এক আবহে মেতে উঠেছিল রাজধানীর মওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়াম। কিশোরী থেকে তরুণী—সবার হাতে হকি স্টিক, চোখে স্বপ্ন আর পায়ে দুরন্ত গতি। ক্রিকেট ও ফুটবলের ছায়া পেরিয়ে এবার আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ডানা মেলছে বাংলাদেশের নারী হকি। এক সময় যে খেলাটি সীমাবদ্ধ ছিল হাতে গোনা কিছু ঘরোয়া আয়োজনের মধ্যে, আজ তা ছড়িয়ে পড়ছে জাতীয় পরিসরে।
এই সম্ভাবনার বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে সদ্যসমাপ্ত ব্র্যাক ব্যাংক ‘অপরাজেয় আলো’ নারী হকি টুর্নামেন্ট। দেশের ১৮টি জেলাকে চারটি অঞ্চলে ভাগ করে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন ৩৫২ জন নারী খেলোয়াড়—যা বাংলাদেশের নারী হকির ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ঘরোয়া আয়োজন। অনেক মেয়ের কাছেই এই টুর্নামেন্ট ছিল হকি স্টিক ও বলের সঙ্গে প্রথম পরিচয়। আবার অনেকের জীবনে প্রথমবার ঢাকায় এসে আন্তর্জাতিক মানের টার্ফে খেলার অভিজ্ঞতা।
টুর্নামেন্টের সংক্ষিপ্ত তথ্য :
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| টুর্নামেন্টের নাম | ব্র্যাক ব্যাংক ‘অপরাজেয় আলো’ নারী হকি |
| অংশগ্রহণকারী জেলা | ১৮টি |
| মোট খেলোয়াড় | ৩৫২ জন |
| চ্যাম্পিয়ন | জোন–৫ (বিকেএসপি) |
| রানার্সআপ | জোন–৪ (ময়মনসিংহ অঞ্চল) |
| ফাইনালের ফল | ৮–০ গোল |
| সেরা খেলোয়াড় | আইরিন আক্তার (বিকেএসপি) |
| সেরা গোলদাতা | অর্পিতা পাল (২২ গোল) |
ফাইনালে ময়মনসিংহকে নিয়ে গড়া জোন–৪ দলকে ৮–০ গোলে বিধ্বস্ত করে শিরোপা জিতে নেয় বিকেএসপিকে প্রতিনিধিত্ব করা জোন–৫। ম্যাচে একাই চার গোল করে নজর কাড়েন কণা আক্তার। পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই বিকেএসপির দাপট ছিল চোখে পড়ার মতো। পাঁচ ম্যাচে তারা গোল করেছে ৬৫টি, হজম করেনি একটি গোলও—যা দেশের নারী হকির বাস্তব চিত্র ও বৈষম্য দুটোই স্পষ্ট করে।
এই ব্যবধানের পেছনে বড় কারণ সুযোগ-সুবিধা। বিকেএসপির মেয়েরা নিয়মিত টার্ফে অনুশীলন, মানসম্মত খাবার ও একাধিক কোচের তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ পায়। বিপরীতে জেলা পর্যায়ে মেয়েদের হকি চর্চা এখনো অনিয়মিত, অনেক জায়গায় ঘাসের মাঠেই সীমাবদ্ধ। ফেডারেশন টুর্নামেন্ট আয়োজন করলে তড়িঘড়ি দল গঠনের বাস্তবতা এখনো কাটেনি।
তবুও আশার আলো আছে। এই টুর্নামেন্টে সেরা গোলকিপার হয়েছেন রাজশাহীর মহুয়া, উদীয়মান তারকা নির্বাচিত হয়েছেন অপূর্ব আক্তার জান্নাতুল। সেরা খেলোয়াড় আইরিন আক্তার—যিনি এসএসসি পরীক্ষার্থী হয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন—বললেন, “আমরাই নারী হকির ভবিষ্যৎ। সুযোগ পেলে আমরা দেশকে অনেক দূর নিয়ে যেতে পারব।”
২২ গোল করে সেরা গোলদাতা হয়েছেন বিকেএসপি ও জাতীয় অনূর্ধ্ব-২১ দলের অধিনায়ক অর্পিতা পাল। তবে তাঁর কণ্ঠে রয়েছে আক্ষেপ—শক্ত প্রতিপক্ষের অভাব। ফেডারেশনের কাছে তাঁর আবেদন, মেয়েদের জন্য আরও বেশি ও মানসম্মত ম্যাচ আয়োজনের।
বিকেএসপির কোচ জাহিদ হোসেন ও মওদুদুর রহমানের মতে, এমন আয়োজন ভবিষ্যৎ জাতীয় দল গঠনের ভিত্তি গড়ে দেবে। যদিও বাংলাদেশে এখনো পূর্ণাঙ্গ নারী জাতীয় হকি দল নেই, তবে আগামী মার্চে এশিয়ান হকি ফেডারেশন কাপকে সামনে রেখে দল গঠনের সম্ভাবনা রয়েছে।
ফাইনাল শেষে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও রেফাত উল্লাহ খান আশ্বাস দিয়েছেন, আগামী দিনে এই টুর্নামেন্ট আরও বড় পরিসরে আয়োজন করা হবে। সেই আশ্বাসেই ভর করে বলা যায়—বাংলাদেশের নারী হকি এখন আর কেবল স্বপ্ন নয়, এটি এগিয়ে চলা এক উজ্জ্বল বাস্তবতা।
