ঠাকুরগাঁওয়ে আলুর দামে ভয়াবহ ধস: দিশেহারা প্রান্তিক কৃষকরা

বাংলাদেশের উত্তরের জনপদ ঠাকুরগাঁওয়ে চলতি মৌসুমে আলুর বাম্পার ফলন হলেও কৃষকদের মুখে হাসি নেই। বরং বাজারে আলুর দামে রেকর্ড পরিমাণ ধস নামায় চাষিদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ। উৎপাদন খরচ তো দূরের কথা, মাঠ থেকে আলু তোলার শ্রমিকের মজুরিও তুলতে পারছেন না অনেক কৃষক। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ৬০ কেজির এক বস্তা আলু মাত্র ২০০ টাকা দরেও বিক্রি হচ্ছে না, যা কেজিপ্রতি ৩ টাকার সামান্য বেশি। এই চরম মন্দা পরিস্থিতিতে হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করা বা বাড়িতে মজুত রাখা—উভয় ক্ষেত্রেই চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে জেলার কয়েক হাজার আলু চাষির।


মাঠ পর্যায়ের চিত্র ও কৃষকদের হাহাকার

মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) সকালে সদর উপজেলার বেগুনবাড়ি ইউনিয়নের নতুনপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। কৃষক মনসুর আলী তার ১০ বিঘা জমিতে ‘গ্রানুলা’ জাতের আলুর আবাদ করেছেন। শ্রমিকরা জমি থেকে আলু তুলছেন ঠিকই, কিন্তু মাঠের পাশে স্তূপ করে রাখা সেই বস্তাভর্তি আলু কেনার জন্য কোনো পাইকার খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

মনসুর আলী আক্ষেপ করে বলেন, “বিঘা প্রতি সার, বীজ, কীটনাশক ও সেচ বাবদ আমার খরচ হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার টাকা। কিন্তু বর্তমানে বাজারে যে দাম চলছে, তাতে ১০ বিঘা থেকে ১০ হাজার টাকার আলু বিক্রি করাও অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাইকাররা আবার ওজনেও বেশি চাচ্ছেন। আমাদের এখন পথে বসার দশা।” অন্যদিকে কৃষক নুরুল আলম জানান, এবার প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে আলুর আকার কিছুটা ছোট হওয়ায় বড় পাইকাররা বিমুখ হচ্ছেন, ফলে ৩-৪ টাকা কেজিতেও কেউ আলু নিতে চাইছে না।


ঠাকুরগাঁওয়ে আলু চাষ ও হিমাগার পরিস্থিতির পরিসংখ্যান

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলায় আলুর আবাদ ও সংরক্ষণের সক্ষমতার মধ্যে এক বিশাল ব্যবধান রয়েছে। নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরা হলো:

বিষয়তথ্য ও পরিসংখ্যান
আবাদের লক্ষ্যমাত্রা২৮,০০০ হেক্টর
অর্জিত আবাদ২৮,২৮৫ হেক্টর
উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাপ্রায় ৭,০০,০০০ মেট্রিক টন
মোট হিমাগার সংখ্যা১৭টি
সংরক্ষণ ক্ষমতা১,৪৫,৫৩২ মেট্রিক টন
সংকট (সংরক্ষণের অযোগ্য)প্রায় ৫,৫৪,৪৬৮ মেট্রিক টন

বাজার স্থবিরতার কারণ ও বিশেষজ্ঞদের অভিমত

পাইকারি ব্যবসায়ীদের মতে, বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কয়েক গুণ বেশি হওয়ায় এই দরপতন। পৌর শহরের ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম জানান, রমজান মাস চলায় এবং বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে বাজারের কেনাবেচা স্থবির হয়ে পড়েছে। আড়তগুলোতে পর্যাপ্ত পুরোনো আলু মজুত থাকায় তারা নতুন আলু কিনতে সাহস পাচ্ছেন না।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঠাকুরগাঁওয়ের উপ-পরিচালক মাজেদুল ইসলাম বলেন, “গত মৌসুমের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা কৃষকদের সীমিত পরিসরে আলু চাষের পরামর্শ দিয়েছিলাম। কিন্তু অধিক লাভের আশায় চাষিরা অতিরিক্ত জমিতে আবাদ করেছেন। বর্তমানে সারা দেশেই উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং বাইরের জেলাগুলোতে চাহিদা কমে যাওয়ায় দাম পড়ে গেছে।” তিনি আরও জানান, ১৭টি হিমাগারে মোট উৎপাদনের মাত্র ২০ শতাংশ সংরক্ষণ করা সম্ভব। বাকি বিপুল পরিমাণ আলু মাঠেই থেকে যাচ্ছে, যা কৃষকদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

এই সংকট নিরসনে দ্রুত সরকারি পর্যায়ে আলু রপ্তানির উদ্যোগ গ্রহণ করা অথবা শিল্প খাতে আলুর ব্যবহার বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। ভবিষ্যতে লোকসান এড়াতে কৃষকদের পরিকল্পিতভাবে শস্য বহুমুখীকরণ ও বিকল্প ফসল চাষে উৎসাহিত করার ওপর জোর দিচ্ছেন কৃষি কর্মকর্তারা।